গৃহিণী থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা কুষ্টিয়ার সুবর্ণা আক্তার - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

গৃহিণী থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা কুষ্টিয়ার সুবর্ণা আক্তার

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ৯, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের নগর সাঁওতা এলাকার এক সাধারণ গৃহিণী সুবর্ণা আক্তার। সংসারের দায়িত্ব পালন করতে করতেই নিজের ছোট উদ্যোগকে বড় পরিসরে নিয়ে গিয়ে আজ তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তার হাত ধরেই বর্তমানে প্রায় ৩শ নারী নিয়মিত কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, খুব সাধারণভাবে শুরু হয়েছিল সুবর্ণার এই পথচলা। সংসারের কাজ শেষ করে অবসর সময়ে তিনি হাতে সেলাই করে শিশুদের কাঁথা তৈরি করতেন। পাশাপাশি সূচিকর্ম ও নকশীকাঁথা বানানোই ছিল তার নেশা ও ভালো লাগার জায়গা। তখনও তিনি ভাবেননি এই ছোট উদ্যোগ একদিন এত বড় কর্মসংস্থানের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে। সুবর্ণার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে একটি অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে।

একদিন ফেসবুকের মাধ্যমে প্রথম বড় অর্ডার পান তিনি—১০ পিস শিশুদের কাঁথা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তিনি অর্ডারটি সম্পন্ন করে সরবরাহ করেন। কাজের মান ও সময়নিষ্ঠা দেখে ক্রেতা সন্তুষ্ট হন এবং আবারও যোগাযোগ করেন। এরপর আসে আরও বড় অর্ডার—৫০ পিস নকশীকাঁথা। সেই অর্ডারও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করতে সক্ষম হন সুবর্ণা। তার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও মানসম্পন্ন কাজের কারণে ধীরে ধীরে তার কাজের চাহিদা বাড়তে থাকে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচিতি তৈরি হয় এবং নতুন নতুন ক্রেতা যুক্ত হতে থাকেন। অর্ডারের পরিমাণ বাড়তে থাকায় একা কাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন তিনি আশপাশের নারীদের এই কাজে যুক্ত করতে শুরু করেন। কেউ দলবদ্ধভাবে কাজ করেন, আবার কেউ নিজ বাড়িতে বসেই কাঁথা তৈরি করে জমা দেন।

এভাবে ধীরে ধীরে তার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন এলাকার শতাধিক নারী। বর্তমানে প্রায় ৩শ নারী তার এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিয়মিত আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক নারী ঘরের কাজের পাশাপাশি এই কাজ করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন। নিজের জীবন সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে সুবর্ণা আক্তার বলেন, একটা সিনেমার গল্প দেখে অনেক সময় মানুষ কাঁদে। কিন্তু আমার জীবনের গল্পটা সিনেমার গল্পের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অনেক কষ্ট, ধৈর্য আর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজকের এই জায়গায় আসতে পেরেছি। স্থানীয়রা বলছেন, সুবর্ণা আক্তারের এই উদ্যোগ শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি গ্রামীণ নারীদের জন্য একটি বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তার সাফল্যের গল্প এখন অনেক নারীর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।

বিসিক কুষ্টিয়ার ডিজিএম আশানুজ্জামান মুকুল বলেন, সুবর্ণা আক্তারের মতো উদ্যোক্তাদের পাশে আমরা আছি। তাদের কাজকে প্রণোদনা ও সহায়তা দিয়ে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণে সহায়তা করতে চাই। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু উদ্যোক্তা নয়, স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। বিসিক এ ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে সবসময় পাশে থাকবে। সুবর্ণা আক্তার জানান, সরকারি সহযোগিতা ও বিসিকের সমর্থনে তার উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হবে এবং এলাকার নারীদের জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।

স্বামী পরিত্যক্ত জেসমিন আক্তার বলেন, এখানে কাজ শিখে আমি নিজে অর্থ উপার্জন করতে পারি। আগে মনে হত জীবন খুব সীমিত, কিন্তু সুবর্ণা আক্তারের প্রশিক্ষণ পেয়ে এখন আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে এবং নিজের পরিবারের খরচ চালানো সহজ হচ্ছে। এই ধরনের উদ্যোগ শুধু আর্থিক সাহায্যই দেয় না, বরং মানসিক শক্তি ও আত্মনির্ভরতার শিক্ষা দেয়। সুবর্ণা আক্তারের তত্ত্বাবধানে অনেক নারী আজ স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা পেলে সুবর্ণা আক্তারের মতো উদ্যোক্তারা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।