কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। বিভিন্ন সময় এই উপজেলার কয়া ইউনিয়ন আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে উঠে এসেছে। ২৫ শে জুলাই ২০০৯ সালে বন্দুকধারীদের গুলিতে নির্মম ভাবে নিহত হয়েছিলেন তৎকালীন কয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও কুমারখালী উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জামিল হোসেন বাচ্চু।

২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে এই কয়া ইউনিয়নেই ভাংচুর করা হয় ভারতে ব্রিটিশ শাসনবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের বাঙ্গালি বিপ্লবী বাঘা যতীনের ভাস্কর্য। ২০২১ সালে ডিসেম্বর মাসে কয়া ইউনিয়নের কয়া আবাসন প্রকল্প-২ থেকে স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২৩ সালের ১০ জুলাই রাত সাড়ে ১১ টার দিকে কয়া ইউনিয়নের বেড়কালোয়া গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঐ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় কয়া ইউনিয়নের বেড়কালোয়া গ্রামের মেহেদি শেখের ছেলে মন্টু শেখ। উল্লেখযোগ্য এই ঘটনা ছাড়াও বিগত কয়েক বছরে কয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে অনেক সংঘর্ষের ঘটনা। যার প্রকৃত হিসাব মেলানো কঠিন। কয়া ইউনিয়নের ভৌগলিক দিক যদি ভালো করে দেখা যায়, তাহলে দেখতে পাওয়া যায় কয়া ইউনিয়ন মূলত কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের পাশর্^বর্তী ইউনিয়ন এবং এই ইউনিয়নের উত্তর ও দক্ষিন দিক যথাক্রমে পদ্মা ও গড়াই নদী দ্বারা বেষ্ঠিত। কুমারখালী থানার শেষ ইউনিয়ন হওয়ার কারণে এই ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণাতাও উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের তুলনায় অনেক বেশী। এই ইউনিয়নের পূর্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বালি ঘাট, খেয়া ঘাট, বালির ব্যবসা, পদ্মা নদীতে মাছ ধরা, মাদক ব্যবসা এবং জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করেই সকল অভ্যন্তরীন গোলোযোগ। আর সে সকল কারণে কখনো প্রাণ দিতে হয়েছে অনেককে। আবার কখনো মার খেয়ে পঙ্গুত্ব বরণও করতে হয়েছে। পদ্মা নদীতে বালি উত্তোলন এবং বিক্রয় করাকে কেন্দ্র করে এই এলাকার মানুষ প্রায় প্রতি নিয়তই হামলা ও পাল্টা হামলার স্বীকার হয়। জানা যায়, কয়া ইউনিয়নের বেড় কালোয়া গ্রামের সাবেক মেম্বর আব্দুল খালেকের সঙ্গে মৃত কেঁদো শেখের ছেলেদের প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। পদ্মানদীতে মাছ ধরা এবং যে কোনো নির্বাচনসহ বিভিন্ন অজুহাতে প্রায় দু’পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার (১২ জানুয়ারী) সকালে এই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় সোমবার (১৫ জানুয়ারী) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিয়া’র মৃত্যু হয়। একই হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন নিহতের আরেক ভাই আলতাফ হোসেন। তাঁরা উপজেলার কয়া ইউনিয়নের বের কালোয়া গ্রামের মৃত কেঁদো শেখের ছেলে। পেশায় দুই ভাই জেলে। এই ঘটনার পর আহত আলতাফ ও নিহত জিয়ার দাদি গোলাপি বেগম জানিয়েছিলেন, তাদের বাড়ি কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের বেলঘড়িয়া জেলেপাড়ায়। নির্বাচনে নৌকা হেরে যাওয়ার পর থেকে ট্রাকের সমর্থকরা তাদের হুমকি দিচ্ছিল। শুক্রবার ভোর ৬টায় ট্রাকের সমর্থক স্থানীয় খালেক মেম্বারের ছেলে রিপন ও শিপনের নেতৃত্বে ১৫-২০ জন তাদের বাড়ি ভাঙচুর করে। পরে ঘরে ঢুকে তার দুই নাতি জিয়া ও আলতাফকে হাতুড়ি দিয়ে পেটায়। এ সময় বাইরে গুলির শব্দ শুনেছেন বলে জানান তিনি। আহত জিয়া ও আলতাফকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আলতাফ জানান, হামলাকারীরা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তার দুই পা এবং তার ভাই জিয়া’র এক হাত ভেঙে দিয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারী) একাধিক গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের আশঙ্কায় এলাকায় এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রতিপক্ষের অনেক লোকজন গ্রাম ছেড়েছেন। অনেকে ভয়ে দোকানও খুলছে না। বাইরে মানুষজনের উপস্থিতি কম। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে বর্তমানে এলাকা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এলাকাবাসীর সূত্রে আরো জানা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিছুদিন আগে মারামারি হয় এবং জামিরুল নামের একজন ব্যক্তির নিয়ত হন। বেশ কিছুদিন এলাকার ঠান্ডা থাকলেও সুবিধাবাদী একটি দল বিভিন্ন কায়দা কৌশল করে আবারো মারামারি নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। কুমারখালী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে এবং নিয়ন্ত্রণে কয়া ইউনিয়নের বেড় কালুয়া এখন শান্ত। তবে যেকোনো মুহূর্তে এই কয়া ইউনিয়নে খুব বড় ধরনের ঝামেলা হতে পারে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় এটা কোন নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে ঝামেলা না। এই দু পক্ষের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে।কিছু ব্যক্তি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য ঝামেলা তৈরি করছেন আর ঠিক এর মাঝ খানে ৮ নং ওয়ার্ডে রাশিদুল মেম্বারের লোকজন সাবেক খালেক মেম্বারের লোকজনের বাড়ি ভাঙচুর সহ সব লুটপাট করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে একালাজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল ইসলাম স্বপন বলেন, এক শ্রেণীর মানুষ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ও এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে প্রতিপক্ষের (ট্রাক মার্কা) লোকজনের উপর দোষ চাপিয়ে নিজেরা সাধু সাজার চেষ্টা করছে। ঘটনায় সময় ঐ স্থানে কোন গোলাগুলি হয়নি। অথচ বলা হচ্ছে সে নাকি গুলিবিদ্ধ ছিলো। আসলে ঘটনায় জড়িত উভয় পক্ষই নৌকার সমর্থক এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘ দিনের বিরোধ চলমান। এর আগে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। সঠিক ভাবে তদন্ত করলে সত্য ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এখানে ট্রাক প্রতীককে বিশেষ উদ্দেশ্যে জড়ানো হচ্ছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে কয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী হোসেন জানান, আগামীকাল (আজ) আমরা সংবাদ সম্মেলন করে সবকিছু তখন বলবো এখন রাত হয়ে গিয়েছে এখন আর কিছু বলতে চাই না। এ বিষয়ে কুমারখালী থানার ওসি আকিবুল ইসলাম জানান, এই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের ঘটনা নির্বাচনীয় পরবর্তী সময় সংঘটিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ তাদের ফায়দা হাসিলের জন্য এটাকে নির্বাচনীয় সহিংসতা হিসাবে রুপদান করার চেষ্টা করছে। এই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিন বিরাজমান। তবে দোষী যেই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
