বিএনপি শূন্য খোকসা কুমারখালী নির্বাচনের মাঠ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

বিএনপি শূন্য খোকসা কুমারখালী নির্বাচনের মাঠ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ২৮, ২০২৩
বিএনপি শূন্য খোকসা কুমারখালী নির্বাচনের মাঠ

বিএনপি শূন্য খোকসা কুমারখালী নির্বাচনের মাঠ। তাঁতশিল্প এবং ছোট ও মাঝারি শিল্পে সমৃদ্ধ জনপদ কুমারখালী ও পাশ্ববর্তী খোকসা উপজেলার দুটি পৌরসভা ও ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় এলাকা কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসন। ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক কারণে এই আসনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কুমারখালী অপেক্ষাকৃত প্রাচীন জনপদ। এর উত্তরে রয়েছে পাবনা সদর, দক্ষিণে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা, পূর্বে খোকসা উপজেলা এবং পশ্চিমে কুষ্টিয়া সদর।

বিএনপি শূন্য খোকসা কুমারখালী নির্বাচনের মাঠ

বিএনপি শূন্য খোকসা কুমারখালী নির্বাচনের মাঠ

বিএনপি শূন্য খোকসা কুমারখালী নির্বাচনের মাঠ

জনশ্রুতি রয়েছে, নবাব মুর্শিদকুলি খান রাজস্ব সংগ্রহের জন্য কমরকুলি খানকে এই অঞ্চলের কালেক্টর নিযুক্ত করেন। তার নামানুসারেই এই অঞ্চলের নাম হয় ‘কমরখালী’, যার অপভ্রষ্ট-রূপ বর্তমান ‘কুমারখালী’। আবার কুমার নদীর খাল থেকে ‘কুমারখালী’ নামের উৎপত্তি বলেও কেউ কেউ মনে করেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারির কাজে তার জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন এ উপজেলার শিলাইদহে এবং এখানেই তিনি গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থে তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এছাড়া উনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সাংবাদিক সাহিত্যিক এবং উদার হৃদয় সাধক পুরুষ ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক ‘হরিনাথ মজুমদার’ ওরফে ‘কাঙাল হরিনাথ, অমর কথা সাহিত্যিক ‘বিষাদ সিন্ধু’র রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, স্বদেশী আন্দোলনের নেতা বিপ্লবী বাঘা যতীনসহ অনেক কবি-সাহিত্যিক ও বিপ্লবীর জন্মও এই কুমারখালী উপজেলায়। উপমহাদেশের প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক সাধক, মরমী গানের স্রষ্টা ও বাঙলার বাউলের শিরোমণি ফকির লালন শাহের সমাধি রয়েছে এখানে।

google news

গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের কারণে কুমারখালীর অবস্থান ও মর্যাদাও বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। থানা থেকে মহকুমায় উন্নীত হয়ে কুমারখালীকে আবারও থানায় পরিণত করা হয়। ইংরেজ শাসনের পূর্বে কুমারখালী অঞ্চল ছিল ফরিদপুর ও যশোরের অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীকালে থানা কিংবা মহকুমা হিসেবে কুমারখালী যথাক্রমে রাজশাহী, পাবনা, নদীয়া ও সবশেষে কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৮৫৭ সালে পাবনা জেলার অধীনে কুমারখালী, খোকসা, এবং বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশা ও বালিয়াকান্দি থানা নিয়ে কুমারখালী মহকুমার জন্ম হয়। কিন্তু ১৮৭১ সালে ‘কুষ্টিয়া’ নদীয়া জেলার মহকুমা হলে কুমারখালী মহকুমার মর্যাদা হারিয়ে পুনরায় থানায় পরিণত হয়।

একসময় নাটোর-রাজ্যের অধীনে ছিল এই কুমারখালী। পরে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের-জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়। কুমারখালী অঞ্চলে রানী ভবানী ও তার উত্তরপুরুষদের নির্মিত মঠ-মন্দির এবং জনহিতকর কর্মের কিছু নিদর্শন এখনও রয়েছে। একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কুমারখালী উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৫১ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে একলাখ ২৬ হাজার ৪৩১ জন পুরুষ এবং একলাখ ২৪ হাজার ৬৪৭ জন নারী ভোটার।

অপরদিকে খোকসা উপজেলার উত্তরে রয়েছে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা, পূর্বে রাজবাড়ী জেলার পাংশা, দক্ষিণে পাবনা জেলা এবং পশ্চিমে কুমারখালী উপজেলা। একটি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত খোকসা উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা এক লাখ নয়হাজার ৪৭ জন। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৬০৫ জন পুরুষ এবং ৫৪ হাজার ৩৪২ জন নারী ভোটার।

কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের বর্তমান এমপি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সাবেক এমপি শহীদ গোলাম কিবরিয়ার নাতি ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে পাড়া-মহল্লা, চায়ের দোকান সর্বত্রই শুরু হয়েছে ভোটের আলোচনা। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা গণসংযোগে নেমে পড়েছেন। নৌকার মাঝি হতে এই আসনে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন অন্তত অর্ধডজন নেতা। তবে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপির কোন নেতা-কর্মী এখনও নেই মাঠে।

১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়া-৪ আসনে এমপি নির্বাচিত হন গোলাম কিবরিয়া। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর গোলাম কিবরিয়া তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সংবিধানের একজন সিগনেটরি মেম্বারও ছিলেন। গোলাম কিবরিয়া ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর নিজ এলাকা কুমারখালীর বড় মসজিদ ঈদগা মাঠে ঈদের নামাজরত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।

এই আসনটিতে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল হোসেন তরুণ, ১৯৯১ সালে আবদুল আওয়াল মিয়া, ২০০৮ সালে গোলাম কিবরিয়া পরিবারের সুলতানা তরুণ, ২০১৪ সালে আবদুর রউফ এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে শহীদ গোলাম কিবরিয়ার নাতি ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ এমপি নির্বাচিত হন।

এছাড়া আসনটিতে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপির আবদুল হক ও ১৯৯৬ সালের (জুন) নির্বাচনে বিএনপির সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে এ আসনে এমপি হন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) প্রার্থী নূর আলম জিকু। প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে এ আসনে পরাজিত হন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক গোলাম কিবরিয়ার পুত্রবধূ সুলতানা তরুণ। ওই সময় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী ছিলেন সাবেক এমপি আবদুর রউফ।

তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে সুলতানা তরুণ জয়লাভ করেন। আবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আবদুর রউফ অল্প ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন বিদ্রোহী প্রার্থী কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও খোকসা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ সদর উদ্দিন খানকে মোকাবিলা করে। বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা ১৯৯১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে জয়লাভ করলেও চরম কোন্দলের কারণে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পরাজয় বরণ করতে হয়। ওই দুই বারই বিজয়ী হন বিএনপি দলীয় প্রার্থী জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী।

আগামী দ্বাদশ নির্বাচনকে ঘিরে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর ছড়াছড়ি। বর্তমান এমপি ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ ছাড়াও এ আসনে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন- সাবেক এমপি আব্দুর রউফ, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার জাহিদ হোসেন জাফর এবং কুমারখালী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মান্নান খান। এদের মধ্যে খোকসা এলাকার একক প্রার্থী আলহাজ সদর উদ্দিন খান। আর সবাই কুমারখালী এলাকার প্রার্থী।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শহীদ গোলাম কিবরিয়ার নাতি বর্তমান সংসদ সদস্য ও সম্ভাব্য অন্যতম প্রার্থী ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ বলেন, ‘তার সময় কুমারখালী-খোকসা এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল-মাদ্রাসা নির্মাণসহ মানুষের যোগাযোগ সংক্রান্ত ব্যাপক উন্নয়ন কাজ হয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গড়াই নদীর ওপর নবনির্মিত শহীদ গোলাম কিবরিয়া সেতু, প্রায় দুশ’ কোটি টাকা ব্যয়ে পান্টি এলাকায় তিনটি বড় বড় সেতু নির্মাণ, গড়ের মাঠের ব্রিজ নির্মাণ, খোকসা-ওসমানপুর ব্রিজ নির্মাণ কাজ বর্তমানে শুরুর অপেক্ষায়। এছাড়া খোকসা এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্টসহ অনেক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। দুই উপজেলায় অন্তত ২০টি স্কুল ভবন ও ১৫টি মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এলাকায় সার্বিক উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রয়েছে’।

সেলিম আলতাফ জর্জ আরও বলেন, আমার দাদা শহীদ গোলাম কিবরিয়া দেশ ও মানুষের জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন। তার সন্তানরাও মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করছেন। নতুন প্রজন্মের ছেলে হিসেবে আমরাও রাজনীতিতে। পারিবারিকভাবে আমরা সবাই আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং একাধিকবার নির্বাচিত খোকসা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ সদর উদ্দিন খান বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা যাকে ভালো মনে করেন তাকেই মনোনয়ন দেবেন। তবে এই আসনে নির্বাচনে বিএনপির সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীকে মোকাবিলা করতে সদর উদ্দিন খানের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, বিপুল ভোটের ব্যবধানে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছি।

এবার খোকসা-কুমারখালীবাসীর বেশি করে সেবা দিতে চাই। জনগণের পাশে থেকে দলকে গুছিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াসহ আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি দল আমাকে মনোনয়ন দেবে।

সম্ভাব্য প্রার্থী কুমারখালী উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগে আছি এবং ভোটারদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে রয়েছি। কুমারখালী-খোকসা নির্বাচনী এলাকায় আমার অবস্থান ভালো। আমি আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইব।

এদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনোনয়নের প্রত্যাশায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। অপরদিকে কুষ্টিয়া-৪ আসনে বিএনপি দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সাবেক এমপি কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী ও জেলা বিএনপির সদস্য কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আলহাজ নুরুল ইসলাম আনছার প্রামাণিকের নাম শোনা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি চাইবে এই আসনটি পুনরুদ্ধার।

নির্বাচনের বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী বলেন, ‘নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া আমার কোনো নির্বাচনে অংশ নেবনা। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাওয়াার প্রশ্নই আসে না’।

আরও পড়ুন: