স্টাফ রিপোর্টার ॥ কুষ্টিয়া সিটি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মোহাঃ কামরুজামান ও সদ্য সাবেক সভাপতি আবুল কালাম সাজ্জাদ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর কলেজের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহনের পর তাদের কলেজের দুর্নীতি বিরোধী ভূমিকায় দেখা যায়। কিন্তু বছর যেতে না যেতে এই দুই কর্মকর্তা নিজেরাই সিটি কলেজের দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিধি মোতাবেক টেন্ডারের মাধ্যমে মার্কেট নির্মান, দোকান বরাদ্দ এবং গাছ কর্তনের কথা থাকলেও কিভাবে টেন্ডার ব্যতিত তা করা হয়েছে। সেই বিষয়ে নিয়ে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সেই সাথে কলেজটি দুর্নীতির বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন ছাত্র-ছাত্রী সহ অভিভাবকেরা।
অথচ দায়িত্ব গ্রহণের পর কলেজের কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আন্তাজ উদ্দিন ও ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান মজনু’র বিরুদ্ধে কলেজ ফান্ডের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছিলেন বর্তমান অধ্যক্ষ ও সভাপতি আবুল কালাম সাজ্জাদ। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, স্বৈরাচার সরকার পতনের পর ১৯ শে আগস্ট তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এর মেয়াদ শেষ হয়। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন কুষ্টিয়া পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমান মজনু।
২০২৪ সালের ২০ আগস্ট থেকে কলেজটির এ্যাডহোক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক এবং ২০২৫ সালের ৫ই জানুয়ারী থেকে কলেজটির সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবুল কালাম সাজ্জাদ। সভাপতি হিসেবে মতিউর রহমান মজনুর মেয়াদকাল শেষ হলেও কুষ্টিয়া সিটি কলেজের নামে চালু থাকা উত্তরা ব্যাংক কুষ্টিয়া শাখার চলতি হিসাব থেকে সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান মজনুর স্বাক্ষর ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ টাকা তুলে নেয়া হয়। ওই সময়কালে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আন্তাজ উদ্দিন। অভিযোগ কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আন্তাজ উদ্দিনের পূর্ণ সহযোগিতা নিয়ে সাবেক সভাপতি সহ ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা এই টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও সিটি কলেজের সম্মুখে কুষ্টিয়া রাজবাড়ী মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দ নিয়েও ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজন প্রীতির বিষয়েও সেই সময়ে একাধিক স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়।
জানা যায়, কলেজটির সম্মুখে গড়ে ওঠা এই মার্কেটের নীচতলার ৬৯টি দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রেও তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক নিজেদের নামে বরাদ্দ নেওয়ার পাশাপাশি, পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের নাম পরিচয় ব্যবহার করেছেন। কলেজের কাছে থাকা দোকান বরাদ্দের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায় সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান মঞ্জু, তার স্ত্রী, কন্যা সহ পরিবারের সদস্যদের নামে বেশ কয়েকটি দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আন্তাজ উদ্দিনও সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে ছাড়েননি। আন্তাজ উদ্দিন তার নিজের নামে দোকান বরাদ্দ নেওয়ার পাশাপাশি, তার স্ত্রী ছেলে ও পুত্রবধূর নামে বেশ কয়েকটা দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন। বরাদ্দ নেওয়া একটি দোকান শেখ আমানত আলী নামে এক ব্যক্তির কাছে ১৪ লক্ষ বিক্রি করেন। অথচ এই দোকান ক্রয় করতে কলেজ ফান্ডে তিনি মাত্র চার লক্ষ টাকা জমা দেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুষ্টিয়া রাজবাড়ী মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা সেই মার্কেট দ্বিতল করণের কাজ চলমান রয়েছে।
যেখানে নতুন করে ৬৯টি দোকন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং একাংশের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে রয়েছে। যদিও এই বিষয়ে জানেন কলেজের অনেক শিক্ষক কর্মকর্তা। সেই সাথে সিটি কলেজের ঐ মার্কেটের দোকান বরাদ্দ দেওয়ার জন্য টাঙানো হয়েছে ব্যানার। সেখানে যোগাযোগের জন্য ০১৭১২-০৫৮৮০০ এবং ০১৩০৯-১১৭৮১৩ মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোবাইল নাম্বার দুইটি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাঃ কামরুজামানের। যদিও দোকান রবাদ্দের জন্য কোন নিয়ম নীতি মানা হয়নি বলে অভিযোগ কলেজটির একাধিক শিক্ষকের। তবে বিধি মোতাবেক দোকান বরাদ্দের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞত্তি দেওয়ার বিধান থাকলেও তা মানেননি কর্তৃপক্ষ। খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, বর্তমান অধ্যক্ষ মোহাঃ কামরুজামান ও সদ্য সাবেক সভাপতি আবুল কালাম সাজ্জাদ মার্কেট দ্বিতল করার পশাপাশি কলেজের ফার্নিচার বানানোর নামে কলেজের অর্ধশতাধিক গাছ কর্তন করে বিক্রয়ের মাধ্যমে পুরো টাকা আত্নসাৎ করেছেন।
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ মোহাঃ কামরুজামান। অধ্যক্ষের ভাষ্যমতে, কলেজের মার্কেটি দ্বিতল করা হচ্ছে কলেজের নিজস্ব অর্থায়নে এবং গাছ কেটে কলেজের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরি করা হবে। তবে ধারণা করা হচ্ছে কলেজের অধ্যক্ষ মোহাঃ কামরুজামান ও সদ্য সাবেক সভাপতি আবুল কালাম সাজ্জাদ নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ইতিমধ্যে অতি গোপনে দোকান বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সেই সাথে বিনা টেন্ডারে কলেজের নিজস্ব অর্থায়নে দোকান নির্মান করে কলেজে ফান্ডের বিপুল পরিমান টাকা লুট করেছেন।
যা নিয়ে কলেজের শিক্ষক এবং কর্মচারীদের মধ্যে চলছে নানান গুঞ্জন। যদিও এই বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস করেননি কোন শিক্ষক কর্মকর্তা। তবে বিষয়টি সুষ্ঠভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন অনেকেই। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষকদের রাজনীতি এবং লুটপাটের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করণে ফলে শিক্ষার মান নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যা ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের কাছে অপ্রত্যাশিত। এই বিষয়ে সভাপতি আবুল কালাম সাজ্জাদ মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
দোকান বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মোহাঃ কামরুজামান জানান, যাতে লোক আসে সেই জন্য ব্যানার টাঙানো হয়েছে। তবে দোকানের মূল্যের বিষয়ে জানাতে চাইলে তিনি বলেন, দোকানের মূল্য এখনও নিধারণ করা হয়নি। সেই সাথে কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দোকান বরাদ্দের বিষয়ে পত্রিকাতে কোন বিজ্ঞত্তি দেওয়া হয়নি বলে নিশ্চিত করেন তিনি। এই বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসটি এবং উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা ছিলো না। কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত করে আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
