নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়া জেলার ৪টি সংসদীয় আসনের ৫টি পৌরসভা এবং ৬৬ টি ইউনিয়নের ৫৭৮টি ভোট কেন্দ্রের ৩৮২৩টি ভোট কক্ষ সর্বমোট ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ৯১২ জন ভোটারের ভোট গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিলো। যার মধ্যে ছিলো ৮ লাখ ২২ হাজার ৫১৬ জন পুরুষ, ৮ লাখ ২১ হাজার ৩৮৮ জন মহিলা এবং ৮ জন হিজড়া ভোটার। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল মোতাবেক গত রবিবার ৭ জানুয়ারী সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা বিরতিহীন ভাবে ভোট গ্রহণ করা হয়। কুষ্টিয়ার ৪টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ৫৭৮ কেন্দ্রে ভোট গ্রহন করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর), কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) এবং কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে কঠোর নিপত্তায় সুষ্ঠ ও স্বাভাবিক ভোট গ্রহন হলেও কুষ্টিয়া-১ (সদর) আসনের ভোট নিয়ে চলছে নানান ধোয়াশা। কুষ্টিয়া-১ (সদর) আসনের ভোট কেন্দ্র গুলোতে ভোটার উপস্থিত চোখে না পড়লেও ভোট পোলের সংখ্যা নিয়ে চলছে নানান সমীকরণ। এই আসনের ভোট কেন্দ্র গুলোর প্রায় অধিকাংশ ছিলো প্রায় ভোটার শূন্য। কোন কেন্দ্রে চোখে পড়ে নাই ভোটারের লাইন।
এছাড়াও অধীকাংশ কেন্দ্রে নৌকা ছাড়া অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ছিলো না বললেই চলে। তবে এই বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, তাদের এজেন্টদের ভোটের আগের রাত্রে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট কেন্দ্র আসতে নিষেধ করা হয়েছে এবং সেই সাথে যারা ভোটের আগে কেন্দ্রে আসার জন্য বাড়ী থেকে রওনা দিয়েছিলেন তাদের অনেকেরই পথ রোধ করে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথবা কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর নৌকা প্রতীকের নেতা কর্মিদের বাঁধার মুখে তারা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারে নাই। আবার যে সমস্ত পোলিং এজেন্ট বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে কেন্দ্রে পৌঁছে ছিলেন, তাদের অধিকাংশদের সকাল ১০টার পর থেকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিছু জায়গায় মহিলাদের জাতীয় পরিচয় পত্র ও মহিলাদের এজেন্ট নিয়োগ পত্র ছিঁড়ে বের করে দেয়। এমনকি প্রিজাইডিং অফিসার কর্তৃক এজেন্টদের বের করে দেয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এই পরিসংখ্যান কুষ্টিয়া পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড এবং ১৩টি ইউনিয়নের ক্ষেত্রে সমান ভাবে প্রযোজ্য।
এছাড়াও কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের উপর বেশ কিছু হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সেই হামলা এখন পর্যন্ত কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে বেশ কয়েকজন চিকিৎসাধীন রয়েছে। আবার অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ী ফিরে গেছেন। ভোটারদের দীর্ঘ লাইন না থাকলেও বা ভোটারদের উপস্থিত চোখে পড়ার মত না হলেও ভোট শেষে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে ভোট দেওয়ার হার ছিলো শতকরা ৪২ দশমিক ২৯ শতাংশ। যার মধ্যে বিভিন্ন কারণে শতকরা ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভোট অবৈধ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও ভোটের বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের বিজয়ী প্রার্থী মাহবুবউল আলম হানিফ বা তার কোন এজেন্টের পক্ষ কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ভোটের ফল ঘোষনার পর কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের বিভিন্ন স্থানে নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের আনন্দ মিছিল করতে দেখা গেছে। কুষ্টিয়া পৌরসভার অনেক স্থানে আনন্দ মিছিল সহ মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা করেছেন নৌকার কর্মি সমর্থকরা। গতকাল সোমবার (৮ জানুয়ারী) মাহবুবউল আলম হানিফ এর কুষ্টিয়ার বাসভবনে পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক নেতা কর্মিরা দলে দলে এসে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছাও জানিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার সূত্রে জানা যায়, এ আসনে ১৪০টি ভোট কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৪ জন। যার মধ্যে ২ লাখ ৫ হাজার ১৫৫ জন পুরুষ ভোটার এবং ২ লাখ ৯ হাজার ৯৩৬ জন মহিলা ভোটার আছে । এছাড়াও এই উপজেলায় আরো ৩ জন হিজড়া ভোটারও আছে। এই আসনে মোট ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৩৩ জন ভোটার। যার মধ্যে ১ লাখ ৭১ হাজার ১৫৭ টি ভোট বৈধ এবং ৪ হাজার ৩৭৬ টি ভোট অবৈধ বলে জানিয়েছেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।
এরমধ্যে নৌকা প্রতীক নিয়ে মাহবুব উল আলম হানিফ পেয়েছেন ১লক্ষ ২৭হাজার ৮০৩ ভোট। আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী পারভেজ আনোয়ার তণু ৪২ হাজার ১শত ৮১ ভোট। মাহবুব উল আলম হানিফ কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনে তৃতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, নির্বাচনের পরে এরা তো আরো ভয়ানক হয়ে যাবে। এরা তো হায়না। রাজনীতি তো আসলে সেবামূলক কাজ কিন্তু এরা তো এটাকে নিয়ে ব্যবসা খুলে বসেছে। তিনি আরো বলেন, কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা অনেক কম ছিল। আপনারাও দেখেছেন এত ভোট হওয়ার কথা নয়। এজন্য আমরা পুণরায় নির্বাচনের জন্য আবেদন করেছি। কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডাঃ এ এফ এম আমিনুল হক রতন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন প্রতি জেলায় জেলায় যে রিটার্নিং অফিসার হবে তাদের অত্যন্ত সুষ্ঠ ভাবে এই নির্বাচন পরিচালনা করতে এবং সবাই মিলেমিশে কাজ করতে হবে যাতে ভোটের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই জিনিসগুলো সমন্বয়ে নস্যাৎ করা হয়েছে।
পক্ষান্তরে কুষ্টিয়াতে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আরো বিতর্কিত করা হয়েছে এ সকল কর্মকান্ড করে। বর্তমান যে নির্বাচন আমরা এটাকে স্থগিত করতে বলছি। স্থগিত বলতে আপনারা যদি মনে করেন এই নির্বাচনকে বর্জন তাহলে বর্জন, যদি মনে করেন প্রত্যাখ্যান তাহলে প্রত্যাখ্যান, এই তিনটি ট্রাম সমার্থক আমাদের জন্য এই মুহূর্তে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো কুষ্টিয়া জেলার সর্বত্র চোখে পড়ার মত। কোন প্রার্থী বা তাদের এজেন্ট এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কোন কথা বলেননি বা অভিযোগ করেননি।
