বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের জারি করা আচরণবিধি প্রকাশ্যেই লঙ্ঘিত হলেও কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না নির্বাচন প্রশাসনকে। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আমির হামজা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত ব্যানার ও ফেস্টুনে বাধ্যতামূলক মুদ্রণ তথ্য উল্লেখ না করে আচরণবিধি ভঙ্গ করছেন। ধারণা করা হচ্ছে নির্বাচনী ব্যয় গোপন করতেই সুকৌশলে তথ্য গোপন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আমির হামজা। যার ফলে নির্বাচনে কালো টাকা ব্যবহারের প্রশ্ন উঠেছে আমির হামজার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন গত ১০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে “সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা” শিরোনামে ১৫ পৃষ্ঠার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে মোট ৩১টি বিধিমালা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এর মধ্যে ৭ নম্বর বিধিমালা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট ও বিলবোর্ড সংক্রান্ত বিধান নির্ধারণ করে। ওই বিধিমালার ‘ঝ’ উপবিধিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে “মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও মুদ্রণের তারিখ বিহীন কোনো লিফলেট, হ্যান্ডবিল বা ফেস্টুন ব্যবহার করা যাইবে না।” সরেজমিনে কুষ্টিয়া পৌরসভা এলাকা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে প্রার্থীদের ব্যানার ঝুলছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়া পৌরসভার এনএস রোড এলাকাজুড়ে চোখে পড়ছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর একাধিক ব্যানার। তবে এসব ব্যানারের কোনোটিতেই মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও মুদ্রণের তারিখ উল্লেখ নেই। যা নির্বাচন কমিশনের জারি করা আচরণবিধির সরাসরি ও স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি একাধিকবার নির্বাচন প্রশাসনকে জানানো হলেও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা বা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিএনপির একাধিক স্থানীয় নেতা জানান, তারা অভিযোগ দিলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, জেলা রির্টানিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশন একটি দলের হয়ে পক্ষপাতিত্ব মূলক কাজ করছে তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামনের দিন গুলো এভাবে চলতে থাকলে নির্বাচন শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। প্রজ্ঞাপনের ২৭ নম্বর বিধিমালায় আচরণবিধি লঙ্ঘনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার (আরপিও), ১৯৭২-এর আর্টিকেল ৯১বি (৩) ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। ২৭ নম্বর বিধিমালার ‘ক’ উপধারা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কেউ নির্বাচনপূর্ব সময়ে বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড, অথবা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
‘খ’ উপধারা অনুযায়ী, কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট দলকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। এদিকে এ ঘটনায় ক্রমশই সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, ব্যানারে মুদ্রণ তথ্য না থাকলে নির্বাচনী ব্যয়ে কালো টাকার ব্যবহার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে বলেও মনে করছেন তারা। এ বিষয়ে জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যাপক সুজাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। প্রাথমিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শুরুতে কিছু ব্যানারে সমস্যা ছিল, পরে যেগুলো ছাপা হয়েছে সেগুলোতে সব তথ্য আছে। বিষয়টি আমি দেখছি।” অন্যদিকে দুদক কুষ্টিয়ার উপপরিচালক মইনুল হাসান রওসনী বলেন, বিষয়টি আমাদের প্রধান কার্যালয়ে জানানো হবে। সেখান থেকে নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে জানতে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মো. ইকবাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একই আচরণবিধি সব প্রার্থী ও দলের জন্য প্রযোজ্য হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগে বৈষম্য হচ্ছে কি না সে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
