বিশেষ প্রতিনিধি ॥ নির্মাণ কাজ শুরুর পর এক যুগ পার হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ব্যয় বেড়েছে ৪০৭ কোটি টাকা। বহি:বিভাগ চালুর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সে এ হাসাপতালের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
এরপর প্রায় ৭ মাস অতিবাহিত হলেও হাসপাতালের আর কোন অগ্রগতি হয়নি। এ অবস্থায় রোগির চাপ সামলাতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসাপাতল কর্তৃপক্ষ।
জনজীবনে নেমে এসেছে সীমাহীন দুর্ভোগ। জানা গেছে, ২০১১ সালে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ছাত্র ভর্তি ও একডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। নিজস্ব ভবন না থাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে কুষ্টিয়া মেডিকেল স্কুলে (ম্যাট্স) চলে এ কার্যক্রম। পরে ২০১২ সালে ২৭৫ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয় ধরে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও শেষ হয়নি।
তখন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ২০১৮ সাল পর্যন্ত নানা জটিলতায় কাজ বন্ধ থাকে। ২০১৮ সালে প্রথম দফায় কাজের মেয়াদ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে নির্মাণের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬১১ কোটি টাকা। কিন্তু এ সময়েও কাজ শেষ করতে পারেননি ঠিকাদার।
দ্বিতীয় দফায় ২০২১ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। এবার ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮২ কোটি টাকা, যা প্রথমে ধরা ব্যয় থেকে ৪০৭ কোটি টাকা বেশি। ২০২২ সালের প্রথম দিকে ছয়তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবন, চারতলা করে দুটি হোস্টেল, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য তিন ও দুই তলাবিশিষ্ট ডরমেটরি, মসজিদসহ আরও কিছু ভবন হস্তান্তর করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে নিজস্ব ক্যাম্পাসে শুরু কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম।
এরপর ধীরগতিতে চলতে থাকে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনের নির্মাণ কাজ। ওই মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয়বারের মতো ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শেষ হয় গত ফেব্রুয়ারী মাসে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারী গণপূর্ত বিভাগ হাসপাতাল ভবন বুঝিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষের কাছে।
সাততলা হাসপাতাল ভবনে ৫০০ শয্যার পাশাপাশি ৮৮টি কেবিন, ২৩ শয্যার সিসিইউ, ২০ শয্যার আইসিইউ সেবা থাকছে। এ ছাড়া জরুরি সেবা দিতে আলাদা আরও ১৩০ শয্যার ব্যবস্থা থাকছে। এদিকে বহি:বিভাগ চালুর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সে এ হাসাপতালের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
এরপর ৭ মাস পার হলেও হাসপাতালের আন্ত:বিভাগ তথা রোগি ভর্তিসহ অন্যান্য কার্যক্রম শুরু করতে ব্যার্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে নারী-পুরুষ ও শিশু দিয়ে প্রায় ৫ শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন। নিচের তলায় চিকিৎসকরা রোগী দেখছেন।
তবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে রোগীদের বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। আহাদ আলী নামে একজন রোগী বলেন, ডাক্তার তাকে এক্সরে করে আনতে বলেছেন। এই মেডিকেলে কলেঝে কোন টেষ্ট করার ব্যবস্থা নেই। মোটা টাকা দিয়ে ৪ কিলোমিটার দূরে কুষ্টিয়া শহরের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এ এক্সরে করিয়েছেন। এতে তার সময় নষ্ট ও ভোগান্তি হয়েছে। হাসপাতালের ওপরে সব কক্ষ প্রস্তত করা হয়েছে। ভেতরে অনেক রুমে দামি সব যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচার পড়ে আছে।
এসব যন্ত্রপাতি বাক্স বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে এমআরআই, সনো, এক্সরে মেশিনসহ প্রায় ১৩ প্রকার দামি যন্ত্র অলস পড়ে রয়েছে। এদিকে, যন্ত্রপাতি কিনে আনার পর তা নিয়েও আবার অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে যে মানের যন্ত্র কেনার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেই শর্ত না মেনে যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি দল তদন্ত করছে।
তারাও প্রাথমিক ভাবে অনিয়মের বিষয়টি প্রমান পেয়েছে বলে জানা গেছে। দুদক কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক নীল কমল পাল বলেন,‘ আমরা অভিযান চালিয়েছি। তদন্ত চলমান আছে। অন্যদিকে হাসপাতালের আন্ত:বিভাগ চালু না হওয়ায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এই মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের।
তাদের ইন্টার্নির জন্য প্রতিদিন ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরের কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে যেতে হয়। এতে তাদের পড়ালেখা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বুধবার (১০ জুলাই) শিক্ষার্থীরা ক্লাশ পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলনে নামেন। আন্দোলকারী শিক্ষার্থীদের নেতা ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন সৈকত জানান, ১ মাসের মধ্যে মেডিকেল কলেজ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হলে তারা লাগাতার কর্মসূচী দেবন।
এদিকে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেখানে ফাঁকা পড়ে আছে সেখানে উল্টো চিত্র কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের। আশেপাশের প্রায় তিনটি জেলার মানুষের চাপে নাজেহালে চিকিৎসা নিতে আসা লোকজন ও চিকিৎসকরা। রোগীর চাপে গিজগিজ করছে ওয়ার্ড থেকে বারান্দা।
আছে নানা অভিযোগ। সরেজমিন গিয়েও দেখা গেছে একই চিত্র। হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও আন্ত:বিভাগে রোগীর চাপে পা ফেলার মত জায়গা নেই। বেড না পেয়ে মেঝে এমনকি খালি স্থানে পাটি ও চাদর পেতে কোন মতে চিকিৎসা নিচ্ছে লোকজন। প্রতিদিন আন্তঃবিভাগে রোগী ভর্তি থাকছে গড়ে ৬৫০ থেকে ৭৫০জন। আর বহির্বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছে দেড় হাজার মানুষ। আর জরুরী বিভাগে গড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০জন চিকিৎসা নিচ্ছে।
বিশাল এই রোগীর ভাগে স্বাস্থ্য সেবা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তারপরও গোজামিলে চলছে কাযক্রম। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন হাসপাতালের আসাবিক মেডিকেল অফিসার। আর এ অবস্থা থেকে পরিত্রান দিতে পারে খালি পড়ে থাকা কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
আবাসিক মেডিকেল অফিসার তাপস কুমার সরকার বলেন, রোগীর চাপে দিশেহারা সবাই। মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেখানে ফাঁকা পড়ে আছে সেখানে জেনারেল হাসপাতালে পা ফেলার জায়গা নেই। তিন থেকে ৪টি জেলার রোগীর চাপ এই হাসপাতালে। সংকট আছে, তারপরও আমরা সাধ্যমত সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
আর কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ এইচ এম আনোয়ারুল কবির বলেন, প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না হওয়া এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় এখনো পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে খুব শিগগিরই চালু করা সম্ভব হবে বলে জানান, এ কর্মকর্তা।
