কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুদকের অভিযান
নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পৌনে ৩শ কোটির প্রাক্কলন ব্যয় বেড়ে ৭শ কোটি টাকা । মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধনের দীর্ঘ ১০ বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে গত বছর ১৪ নভেম্বর (মঙ্গলবার) ২০২৩ সালে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উদ্বোধন ঘোষনা করেন।
এরপর ৭ মাসের বেশী সময় কেটে গেলেও ৫শ শয্যার কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবনে ইনডোর স্বাস্থ্যসেবা শুরু হয়নি আজও। এতে সীমাহীন ভোগান্তির মধ্যেই মেডিকেলের অস্থায়ী হাসপাতাল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে গতকাল বুধবার (৫ জুন)কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে হাসপাতালের বিভিন্ন কেনাকাটায় বাজার মূল্যের কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং চুক্তিপত্র অনুযায়ী সকল পণ্য সরবরাহ না করার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে অপর একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় দুদক টিম অভিযোগে উল্লেখিত হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের ১৯টি মেডিকেল সরঞ্জামাদি ক্রয় বিষয়ক টেন্ডার ডকুমেন্ট যাচাই করে। টিম জানতে পারে, মেডিকেল সরঞ্জামাদি সরবরাহের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসপি ট্রেডিং হাউসকে বিভিন্ন মেয়াদে সময় বৃদ্ধি করে যন্ত্রাংশ সরবরাহে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ তারিখ দেয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি মোট ৬টি যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে। অদ্যাবধি অবশিষ্ট ১৩টি পণ্য সরবরাহ করা হয়নি। যে ৬টি পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। তার টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন, সার্ভে রিপোর্টসহ অন্যান্য রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করে এনফোর্সমেন্ট টিম। নথিপত্র পর্যালোচনা করে অর্থ আত্মসাতসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে টিম কমিশন বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, চুক্তির দুই মাসের মধ্যে সব পণ্য সরবরাহ করার কথা ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। তবে পেরিয়ে গেছে প্রায় এক বছর। এখনো সেই পণ্য সরবরাহ করা হয়নি। তালিকায় থাকা ১৯ ধরনের পণ্যের মধ্যে ৬টি সরবরাহ করা হলেও দাম ধরা হয়েছে বেশুমার। এর মধ্যে একটি পণ্যের প্রকৃত দাম এক কোটি টাকা হলেও এটি কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেই পণ্য সরবরাহের সময় প্রত্যাখ্যানও করেছিল। দীর্ঘসময়ে পণ্য সরবরাহ ব্যর্থতা এবং কম দামি পণ্য বেশি দামে সরবরাহের অপরাধে শাস্তি হওয়ার কথা থাকলেও উল্টো পুরস্কৃত হতে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। কেনাকাটায় লুটপাটের এমন আয়োজন করা হয়েছে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের যন্ত্রাংশ কেনাকাটার ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ঠিকাদারি কাজ পায় এসপি ট্রেডিং হাউস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গত ২০২২ সালের ৪ জুন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক চৌধুরী সারওয়ার জাহান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক হাফিজুর রহমান পুলকের মধ্যে একটি চুক্তি স্বারিত হয়। চুক্তি অনুসারে এক মাসের মধ্যে এই পণ্য সরবরাহের কথা ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। তবে এরপর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখনো পণ্য বুঝিয়ে দেয়নি।
নথি থেকে জানা যায়, নিউরো সার্জারি বিভাগের নানা ধরনের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করার কথা ছিল ঠিকাদারের।এর মধ্যে কেবল ৬টি পণ্য সরবরাহ করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে ইমেজ গাইডেড নিউরো নেভিগেশন সিস্টেম ফর ক্রানিয়াল অ্যান্ড স্পাইনাল সার্জারি, ইনট্রা অপারেটিভ নার্ভ মনিটর ফর ক্রানিয়াল অ্যান্ড স্পাইনাল সার্জারি সেট এবং থ্রিডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন মাইক্রোসকোপ সিস্টেম ফর মাইক্রো নিউরো সার্জারি সেট। এর মধ্যে থ্রিডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন মাইক্রোসকোপ সিস্টেম ফর মাইক্রো নিউরো সার্জারি সেটের দাম এক কোটি টাকা।
তবে এই পণ্যের যে বিল জমা দেওয়া হয়েছে, সেখানে লেখা রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা।সূত্র জানায়, এসব পণ্য সরবরাহ করা হলেও তা গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তারা বিলও দেয়নি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এমন অস্বাভাবিক বিল জমা দেওয়ার বিষয়টি তদন্তও করেনি। সূত্র বলছে, বিষয়টি দফারফার জন্যে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সূত্র বলছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুরো কাজের বিল পাওয়ার জন্যে দেন-দরবার করছে। সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়া, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণসহ নানা দুর্বলতা ধামাচাপা দিতে দৌড়ঝাঁপ করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে।জানা যায়, সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একটি চিঠি দেয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। এতে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ডলার সংকট হওয়ায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঠিকাদার সময়মতো যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে পারেননি।
ওই চিঠিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বৃদ্ধির আবেদন করে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্তৃক মঞ্জুরও হয়। তবে তথ্য বলছে, এর পরও বেশ কয়েকমাস পেরিয়ে গেছে। কিন্ত যন্ত্রপাতিগুলো সরবরাহ করা হয়নি। এছাড়াও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত, স্বাস্থ্য ও সংস্থাপন বিভাগের অব্যবস্থাপনা ও অস্বচ্ছতার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাজের মেয়াদে দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্প ব্যয় হয়েছে তিনগুণেরও বেশি। নির্মাণ পদ্ধতি লড়ঘন করায় ছাদ ধসে শ্রমিকের মৃত্যুসহ কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সব সময়ই ছিলো আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে।
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন চেয়ে একনেক সভায় উপস্থাপিত উন্নয়ন প্রস্তাবনায় ক্ষুব্ধ হয়ে একনেক সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই তদন্তের ৭৫ পাতার প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের কথা উল্লেখ পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করেছিলো তদন্ত কমিটি। জেলার সচেতন নাগরিকদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের লেবাসে সরকারের উন্নয়ন সফলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে অনিয়ম-দুর্নীতির হোতারা। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়াসহ আশপাশের পাঁচ জেলার মানুষের চাহিদা মাথায় রেখে একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের।
কিন্তপ্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন, দরবৃদ্ধি করে কার্যাদেশ দেওয়াসহ নানা অনিয়মের সত্যতা উঠে আসে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প ‘বাস্তবায়ন, পরিবীণ ও মূল্যায়ন বিভাগ’ (আইএমইডি) পরিদর্শনের পর দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে। সেখানে প্রকল্পটির নির্মাণাধীন একাডেমিক, হাসপাতাল, ছাত্রাবাস ও আবাসিকসহ সবক’টি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেই নকশা পরিবর্তনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে প্রকল্পটির প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেঁধে দেওয়া ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘন করে অনুমোদন না নিয়েই অর্থ ব্যয় করে সরকারি ক্রয় আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিলো।
নির্ধারিত নকশা পরিবর্তন, নির্মাণ পদ্ধতি লঙ্ঘন করে সঠিক উপকরণ ব্যবহার না করায় ছাদ ধসে শ্রমিকের মৃত্যু, বারবার দর বাড়িয়ে কার্যাদেশ আদায়সহ নানা অনিয়মে অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টি ই এ এল-জহিরুল লিমিটেড প্রকল্প দুর্ঘটনার দায়ে কালো তালিকাভুক্ত হয়। অথচ এখনও বহাল আছে সেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতবড় একটি প্রকল্প সাইটে কাজ চলছে অথচ প্রকল্প সারসংপে সংবলিত কোনো প্রজেক্ট বোর্ড না থাকাটাও অস্বচ্ছতার একটা প্রমাণ। বর্তমান সরকার কুষ্টিয়া জেলায় ছোট-বড় নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের লেবাসে সব উন্নয়ন সফলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে অনিয়ম-দুর্নীতির হোতারা।
