নিজ সংবাদ ॥ শর্ত সাপেক্ষে কুষ্টিয়া চিনিকল সহ ছয় চিনিকলের আখ মাড়াইয়ের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত রবিবার (১৫ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আফরোজা বেগম পারুল স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১লা ডিসেম্বর ৩৬,০০,০০০০,০৬৪.২০.০১১.২০-১১৬ নং স্মারকমূলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) এর অধীন ৬টি (শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় ও রংপুর) চিনিকলের আখ মাড়াইয়ের স্থগিতাদেশ প্রদান করা হয়। এদিকে গত মঙ্গলবার (৩ ডিসেম্বর) মাড়াই স্থগিতকৃত চিনিকলসমূহ পুনরায় চালু করার জন্য এবং চিনিকল লাভজনকভাবে চালানোর নিমিত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত টাঙ্কফোর্সের সুপারিশ ও মতামতের প্রদান করেন। সেখানে বলা হয়, পর্যাপ্ত আখ প্রাপ্তি সাপেক্ষে ১ম পর্যায়ে শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল, ২য় পর্যায়ে পঞ্চগড় ও পাবনা চিনিকল এবং ৩য় পর্যায়ে কুষ্টিয়া ও রংপুর চিনিকলের মাড়াই কার্যক্রম পুনরায় চালুকরণের লক্ষ্যে উপর্যুক্ত স্থগিতাদেশ এতদ্বারা প্রত্যাহার করা হলো বলে জানানো হয়।
এদিকে গত ২৪ নভেম্বর কুষ্টিয়ার জগতি সুগার মিলের আখ মাড়াই অনতিবিলম্বে চালু করার ব্যাপারে সুগার মিলের ইনচার্জ হাবিবুর রহমানের সাথে মত বিনিময় করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন ও সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারের নেতৃত্বে জেলা বিএনপির প্রতিনিধি দল। এর আগে মিল বন্ধে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারসহ চিনিকলটি পুনরায় চালুর দাবিতে মিলগেটে কয়েক দফা বিক্ষোভ-সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা এবং বিভিন্ন সংগঠন। জানা গেছে, লোকসানের মুখে ২০২০ সালের নভেম্বরে কুষ্টিয়া সুগার মিলের উৎপাদন ও চিনি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটির দিকে নজর নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কারখানা ভবনসহ অন্যান্য অবকাঠামো হয়ে পড়েছে নড়বড়ে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলো মেরামতে অর্থ বরাদ্দ দেয়নি চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন। টানা কয়েক মৌসুম বন্ধ থাকায় চিনিকলটির অভ্যন্তরে বিরাজ করছে ভূতুড়ে পরিবেশ ও সুনসান নীরবতা। এককালের জৌলুসপূর্ণ এই মিলে এখন নেই কর্মব্যস্ততা ও প্রাণের কলরব। সব মিলিয়ে এক সময়ের নামকরা এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি যেন এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপে রূপলাভের অপেক্ষার প্রহর গুনছে। চাষাবাদের জন্য অতি উর্বর কুষ্টিয়ার মাটিতে আখ চাষের সেরা মানের পরিবেশ থাকায় ১৯৬১ সালে ২২১ দশমিক ৪৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়া চিনিকল। ১৯৬৫-৬৬ অর্থবছর থেকে শুরু হয় আখ মাড়াই কার্যক্রম। পরে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রায়ত্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার।
কলটির প্রতিদিনের চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক মাড়াই ক্ষমতা ১৫ হাজার মেট্রিক টন। কুষ্টিয়া চিনিকলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি সুপারিশপত্রে চিনি উৎপাদন, আখের জমি হ্রাসকরণ, মিলের ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা, লোকসান ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ঊর্ধ্বগামী হওয়ায় দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে কুষ্টিয়া চিনিকলসহ ছয়টি চিনিকলে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে আখ মাড়াই মৌসুমে উৎপাদন স্থগিত করা হয়। জানা গেছে, প্রতি মৌসুমে চিনি উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও এ মিলে লাভের চেয়ে লোকসানই হচ্ছে বেশি। তবে ১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছরে ২ কোটি ৬১ লাখ ও ৯৫-৯৬ অর্থ বছরে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা মিলে লাভ হয়। এছাড়া বিগত ২০০১-২০০২ থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছর পর্যন্ত গত ১৯ বছরের হিসাবমতে লোকাসন হয়েছে ৪১৫ কোটি টাকা। চালুর প্রথমদিকে মিলটি লাভজনক হলেও পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, অনিয়ম-দুর্নীতি ও মাথাভারী প্রশাসনসহ নানা কারণে ক্রমাগত লোকসানের ঊর্ধ্বগতিতে মিলটি এখন অতি রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে লোকসানের বিশাল বোঝা মাথায় নিয়ে কৃষিভিত্তিক একমাত্র এ প্রতিষ্ঠানটি পড়ে চরম হুমকিতে। মিল বন্ধ থাকায় আখ উৎপাদন মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। তবে কুষ্টিয়া জোনের আওতায় চাষ করা আখ মোবারকগঞ্জ, ফরিদপুর ও দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোং চিনিকলে সরবরাহ করছেন চাষিরা। মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কুষ্টিয়ার সুশীল সমাজের মানুষ বলেন, ২০২০ সালে লোকসান ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ঊর্ধ্বগামী হওয়ায় আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন বন্ধ। মিলটি চালুর সিদ্ধান্তের ফলে সম্ভাবনাময় এ মিলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে আমরা খুশী। মিলটি দ্রুত আধুনিকরণসহ মিলটিকে রক্ষায় সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা। তারা আরও বলেন, এককালের জলুসপূর্ণ এই মিলে এখন নেই কর্ম-ব্যস্ততা ও প্রাণের কলরব। মিলের প্রায় শতাধিক কোয়ার্টার এখন পরিত্যক্ত। বাউন্ডারি ঘেরা মিলের ২২১ একর জায়গাজুড়ে ঘাস, লতা-পাতায় সয়লাব। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মিল ভবন ও টিনের ছাউনিসহ অন্যান্য স্থাপনা, আখ পরিবহনে ব্যবহৃত লরি, মিলের সুউচ্চ চিমনি, ভারী মেশিনারি ও বৈদ্যুতিক মোটরসহ শতকোটি টাকার যন্ত্র নষ্ট হওয়ার পথে। অসংখ্য কর্মচারী কাজ হারিয়ে পরিবার-পরিজনসহ মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। মিল বন্ধ থাকায় আখ উৎপাদন মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। কুষ্টিয়া চিনিকলের ইনচার্জ হাবিবুর রহমান বলেন, ২০২০ সালে আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন বন্ধ ঘোষণার পর থেকে সীমিত পরিসরে মিলের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। কুষ্টিয়া চিনিকল চালুর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো। আখ চাষিদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করবো। চিনিকল চালুর বিষয়টি নিয়ে আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবো। কুষ্টিয়ার চিনিকল চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, গত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার ও দোসররা দূর্ণীতির মাধ্যমে দেশের সকল বড় বড় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। দেশের অর্থনীতিকে আওয়ামী ও দোসররা ধ্বংস করে ফেলেছে। তারা দেশের উন্নয়নের নামে বড় বড় প্রজেক্টের মাধ্যমে দূর্ণীতি অভিনব পন্থা অবলম্বন করে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে। কুষ্টিয়া সুগার মিল চালু হলে কুষ্টিয়াসহ দেশের অর্থনীতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সেই সাথে কুষ্টিয়া চিনিকলের শ্রমিকদের দীর্ঘ দিনের কষ্ট লাঘব হবে।
