নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের ভিতরে অবস্থিত কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও দৃশ্যত ছিলো তার বিপরীত চিত্র। অনিয়ম আর দূর্ণীতিই যেখানে পরিণত হয়েছিলো নিয়মে। নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে আত্নীয়করণের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছিলো কুষ্টিয়ার স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। আর এসকল অপকর্মের মূল হোতা ছিলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি সাহা এবং জেলা মহিলা লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক ও স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক জাল সনদধারী আফরোজা আক্তার ডিউ। আফরোজা আক্তার ডিউ জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক অপর জাল সনদধারী রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব।
এছাড়াও ডিউ এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ভূয়া বিল ও ভাউচার দিয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। বিপ্লব ও ডিউ দুইজনেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সমপৃক্ত থাকার কারণে ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন কর্মকর্তা বা শিক্ষক তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সহস পেতেন না। আর সেই কারণেই নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য তাদের সাথে বিশেষ সখ্যতা গড়ে তোলেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি সাহা। এই তিন জন মিলে গত আওয়ামী সরকারের শাসন আমলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের সার্থে ব্যবহার করে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিপ্লব ও ডিউ’র রজিনৈতিক প্রভাবের কারণে স্কুলে নিয়োগ থেকে শুরু করে সবকিছুই কন্ট্রোল করতেন প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি সাহা।
আফরোজা আক্তার ডিউ দিনের পর দিন স্কুলে ক্লাস না নিলেও সেই বিষয়ে কোন দিন জেলা প্রশাসক বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কোন অভিযোগ দেননি প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘ প্রায় এক যুগেরও বেশী সময় ধরে জাল সনদে ডিউ চাকুরী করলেও তা তিনি কারো নজরে আসতে দেন নাই।এছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যত শিক্ষকদের খন্ড কালীন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তা মূলত ডিউ, বিপ্লব ও মৃণাল কান্তি সাহা ইচ্ছা অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে। খন্ড কালীন শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি স্থানীয় কোন মিডিয়া তালিকাভুক্ত পত্রিকা বা জাতীয় কোন পত্র পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়নি। আর এই প্রকার সকল অনৈতিক কর্মকান্ড জেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই করা হতো।এদিকে গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ শাসিত সরকারের পতন হয়।
এরপর রাতারাতি বদলে যায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি। ঐ একই দিন জেলা মহিলা লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক ও স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক জাল সনদধারী আফরোজা আক্তার ডিউ এবং তার স্বামী জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম বিপ্লবও জনরোশে পড়ে কুষ্টিয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর থেকে এই জাল সনদধারী দম্পতিকে কুষ্টিয়া সহ সারা দেশে প্রকাশ্যে দেখা যায় নি। কিন্তু প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও আড়ালে থেকেই তারা তাদের অনৈতিক কর্মকান্ড পূর্বের ন্যায় চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এখন পর্যন্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি সাহা সাথে তাদের যোগাযোগ আছে। যা স্কুলের সাথে সমপৃক্ত সবাই কমবেশী জানে।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি সাহা তা অকপটে প্রতিবেদকের কাছে স্বীকারও করেছেন।স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি সাহার সাথে ডিউ ও বিপ্লবের বিশেষ সখ্যতা থাকার কারণে তিনি এখন পর্যন্ত ডিউ এর চাকুরী বাঁচাতে গোপনে ভূমিকা রেখে চলেছেন। সেই সাথে ডিউ ও বিপ্লবের নির্দেশে এবং জেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যাক্তিদের ম্যানেজ করে গত ২১ আগস্ট ২০২৪ ইং তারিখে তড়িঘড়ি করে ১১ জন খন্ডকালীন শিক্ষককে স্থায়ীকরণ করে গেছে কুষ্টিয়ার সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক এহেতেশাম রেজা। যা অত্যন্ত গোপনে করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একযোগে ১১ জন খন্ডকালীন শিক্ষককে স্থায়ীকরণের বিষয়টি নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। যদিও এই সমস্ত বিষয় অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি সাহা। কিন্তু তার নিজের নিয়োগ নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।
প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলে তিনি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও অনৈতিক ভাবে অসৎ উপায় অবলম্বন করে প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। যা পরবর্তি রিপোর্টে তুলে ধরা হবে।খন্ডকালীন শিক্ষক থেকে যাদের স্থায়ীকরণ করা হয়েছে তারা হলেন, সহকারী শিক্ষক হেলেনা পারভীন, কামরুন্নাহার মিথিলা, জুয়েল রানা, সিতারা ইসলাম, মোছাঃ সোনিয়া শারমিন, মোঃ তুহিনুর রহমান, মোঃ জহিরুল ইসলাম (জহির), ফারহানা মাহমুদা, আফরিন সুলতানা, মোঃ ইমরান হোসেন (ইরান) এবং শাকিলা আক্তার সাথী।এছাড়াও খন্ডকালীন যে সকল শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ করা হয়েছে তাদের নিয়োগ নিয়েও রয়েছে নানান গুঞ্জন। যে ১১ জন শিক্ষককে স্থায়ীকরণ করা হয়েছে তারা মূলত তিন দফায় নিয়োগ প্রাপ্ত হয়। সেই নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন ও শিথিল করার অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষক সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
নিয়োগ প্রাপ্তীর সময় বর্তমান সহকারী শিক্ষক ফারহানা মাহ্মুদা ও ইমরান হোসেন ইরান অনার্স পাস না হাওয়ার পরও তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য নিয়োগ প্রাপ্তীর সময় এই দুই শিক্ষক অনার্সে অধ্যায়ণরত ছিলেন বলে জানা গেছে।এই বিষয়ে জানতে ফারহানা মাহ্মুদা এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নাই। জানতে চাইলে ইমরান হোসেন ইরান বলেন, আমি ২০১৮ সালে অনার্স পাস করেছি এবং ২০১৯ সালে আমার চাকুরী হয়েছে। এই বিষয়ে আপনি প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করলে আরও ভালো জানতে পারবেন।
আর এই সকল অপকর্মের সাথে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের শিক্ষা শাখার তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ফয়জুলের নামও উঠে এসেছে। তিনি কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে বিগত প্রায় ১৪ বছর যাবৎ একই পদে কর্মরত রয়েছেন এবং আফরোজা আক্তার ডিউ এর সাথে তার দীর্ঘ দিনের বিশেষ সখ্যতা রয়েছে বলেও জানা গেছে।এদিকে কুষ্টিয়া জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক আফরোজা আক্তার ডিউয়ের বিরুদ্ধে স্নাতক ও মাস্টার্স এর জাল সনদ দিয়ে কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজে সহকারী প্রধানশিক্ষক পদে চাকুরীরত আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জাল সনদে চাকুরীর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে গোপন থাকলেও কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের দুই শিক্ষকের দেওয়া তথ্য বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। আফরোজা আক্তার ডিউ কুষ্টিয়া শহরের পূর্ব মজমপুর এলাকার মৃত সোহরাব হোসেনের মেয়ে ও কুটিয়া জেলা আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম বিপ্লবের স্ত্রী।
অনুসন্ধান বলছে, আফরোজা আক্তার কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ওই একই কলেজে ইংরেজী বিভাগে অনার্স ভর্তি হন। অনার্স এ তৃতীয় বিভাগ নিয়ে পাস করেন। ২০১২ সালের ১৮ই অক্টোবর তৎকালীন সময়ের কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত করেন। তৎকালীন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফ প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। তৎকালীন সচিব এনআই খান একাডেমিক ভবন উদ্বোধন করেন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালেক্টরেট স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, আফরোজা আক্তার ডিউ বিনা কারণেসহকর্মীদের সাথে গালমন্দ করে। শিক্ষকরা তার কোন কথার জবাব দিলেই তিনি তাদের জামাত শিবিরের আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করতো। এছাড়াওআফরোজা আক্তার ডিউ এর বিরুদ্ধেনিয়মিত সকুলে না আসা,ক্ষমতার অপব্যবহার,ক্লাস না নেওয়া,স্কুলের মার্কেট নিজের এবং স্বামীর নামে করে নেওয়া, স্কুল উপস্থিত না হয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, স্কুলে আগত অভিভাবকদের সাথে খারাপ আচরণ করা, ইসলামী পোশাকে কোন ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে আসলে তাদের জঙ্গি ট্যাগ দেওয়া এবং ক্লাস না নিয়েও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে থানা পর্যায়ে সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হওয়া সহ তার মেয়েদের রেজাল্ট জালিয়াতি করার মত গুরুতর অভিযোগের কথা জানান ঐ শিক্ষক।
তিনি আরোও জানান,আফরোজা আক্তার ডিউ এর বড় মেয়ে এসএসসি পর্যন্ত স্কুলে প্রথম হলেও বোর্ড পরীক্ষায় তার রেজাল্ট স্কুলের প্রথম থেকে ১০ জনের মধ্যেও ছিলো না। অনুসন্ধান বলছে, কুষ্টিয়ার তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সাথে রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব ও ডিউ দম্পত্তির দহরম মহরম সম্পর্ক তৈরী হয়। ডিসি বাংলাতো রাত-দিনের যে কোন সময় প্রবেশের সুযোগ ছিলো আফরোজা আক্তার ডিউ। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নেন আফরোজা আক্তার ডিউ। নিয়োগকালে তার একাডেমিক কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করা হয়নি বলেও নিশ্চিত করেন ওই অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ। যেহেতু অনার্স এ তার তৃতীয় বিভাগ ছিলো একারনে বেসরকারী দারুল এহসান নামে (বর্তমানে ইউজিসি কতৃক কালো তালিকাভুক্ত ও হাইকোর্ট থেকে অবৈধ ঘোষিত) একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স ও মাষ্টার্স ডিগ্রী সংগ্রহ করেন ডিউ। ওই সার্টিফিকেট দিয়ে সহকারী প্রধানশিক্ষক হিসেবে অদ্যবদী চাকুরীরত আছেন।
দারুল এহসান থেকে সংগ্রহ করা তার অনার্স সার্টিফিকেটের সিরিয়াল নম্বার-০৪৬৩৭ এবং মাষ্টার্সের সার্টিফিকেট নম্বর-০০৩৯৮১। উক্ত সিরিয়াল নম্বর দিয়ে ইউজিসি কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সার্টিফিকেট দুটি ভূয়া বা জাল।সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে আফরোজা আক্তার ডিউ এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।এসকল বিষয়ে জানতে চাইলে কালেক্টরেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি সাহা বলেন, তাকে ইতিমধ্যে সাময়িক বহিস্কার করা হয়েছে। যদিও তিনি এই সংক্রান্ত কোন তথ্য সাংবাদিকদের দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। একযোগে ১১ জন সহকারী শিক্ষককে স্থায়ীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, স্কুলের সভাপতি জেলা প্রশাসক, সমস্ত কিছু তিনিই করেছেন।১১ জন শিক্ষককে একযোগে স্থায়ীকরণের বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (রেকর্ডরুম শাখা, শিক্ষা শাখা ও ই-সেবা কেন্দ্র) সৈয়দা আফিয়া মাসুমা সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এই বিষয়ে আমি আপনাকে পরে জানাবো।অভিযোগের বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আখতারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি সেই সময় দায়িত্বে ছিলাম না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।
