কুষ্টিয়ার ৩ আসনে নৌকা টালমাটাল, ১টিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার ৩ আসনে নৌকা টালমাটাল, ১টিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জানুয়ারি ৪, ২০২৪

গড়াই পাড়ের জেলা কুষ্টিয়া জেলার ৪টি সংসদীয় আসনের মধ্যে এবার তিনটি আসনে টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। বাকি একটি আসনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ঈগল প্রতীকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক নির্বাচনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কুষ্টিয়ার ৩ আসনে নৌকা টালমাটাল, ১টিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এখানে মূলত লড়াই নৌকার প্রার্থী ও আওয়ামী লীগর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে। জেলার ৪টি আসনের এই প্রার্থীরা এখন সমানে নির্বাচনে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এবার আওয়ামী লীগ এখানকার তিনটি আসনে দলীয় প্রার্থী দিলেও কুষ্টিয়া ২ আসনটি ফাঁকা রাখে এখানে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটের লড়াই নেমেছেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। কুষ্টিয়া ১, ২ ও ৪ আসনে বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে নৌকার প্রার্থীরা। তাদের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে স্বতন্ত্ররা। স্থানীয় ভোটারদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এছাড়া কুষ্টিয়া ৩ আসনে আওয়ামী লীগের হেভি ওয়েট প্রার্থী দলের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এবার সহজে পার পাচ্ছেন না। এবার নির্বাচনী মাঠে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী কুষ্টিয়ার জনপ্রিয় মেয়র পুত্র পারভেজ আনোয়ার তণু এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর): দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে আওয়ামী লীগের টিকেট পেয়েছেন বর্তমান সাংসদ ও দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশা। একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মত আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সহজেই সাংসদ নির্বাচিত হলেও এবার তাকে চেপে ধরেছেন নিজ দলের ৩ স্বতন্ত্র প্রার্থী। একাদশ সংসদে বাদশা নির্বাচিত হওয়ার পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সাংসদ আফাজ উদ্দিন আহমেদ মারা যান। এরপর দলের সভাপতি হন সাংসদ সরোয়ার জাহান বাদশা। তবে তার সময়ে দলের মধ্যকার দ্বিধা বিভক্তি কমার চেয়ে বরং আরো বেড়ে যায়। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও দলের হাইকমান্ড কুষ্টিয়া-১ আসনে নৌকার মাঝি হিসেবে বাদশাকেই বেছে নেন। এবার বাদশাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এখানে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক এমপি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল হক চৌধুরী, সাবেক এমপি আফাজ উদ্দিন আহমেদের ছেলে নাজমুল হুদা পটল ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আল মামুন। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশা। নির্বাচন সামনে রেখে বাদশার গেল ৫ বছরের নানা কর্মকান্ডের চুল চেরা হিসেব কষছেন দলের তৃণমূলের নেতা কর্মীরা। বাদশার বাড়ি উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী ফিলিপনগর এলাকায়। এই চরাঞ্চলে তার ভোট ব্যাংক রয়েছে। তবে এবার সেই ব্যাংকের ভোটে ভাগ বসাচ্ছেন ওই চরাঞ্চলের আরেক জনপ্রিয় মুখ জাসদ মনোনিত প্রার্থী, দলের যুব সংগঠন যুব জোটের কেন্দ্রিয় সভাপতি শরিফুল কবির স্বপন। স্বপন প্রার্থী হওয়া এমন অবস্থায় চরের ভোট ২ ভাগে ভাগ হয়ে যাবে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। এ অবস্থায় অনেকটা ভালো অবস্থায় আছেন সাবেক এমপি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল হক চৌধুরী ও সাবেক এমপি প্রয়াত আফাজ উদ্দিন আহমেদের ছেলে নাজমুল হুদা পটল। স্থানীয় ভোটার বলছেন এবার কুষ্টিয়া-১ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে রেজাউল হক চৌধুরী ট্রাক প্রতিক ও নাজমুল হুদা পটলের ঈগল প্রতিকের মধ্যে। তবে এ দুজনের মধ্যে নাজমুল হুদা পটল দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির একটি অংশের সমর্থন আছেন বলে জানা গেছে।

কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা): জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার গোলাপনগর এলাকায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসন থেকে টানা তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে জাসদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। তবে তিনি দলীয় প্রতিক মশালের বদলে নৌকা প্রতিক নিয়ে লড়ছেন। বিগত তিনটি নির্বাচনে ইনু আওয়ামী লীগ নেতাদের সমর্থন পেলেও এবার দৃশ্যপট আলাদা। এবার সেখানে উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দাপুটে সাধারণ সম্পাদক কামারুল আরেফিন। তার পক্ষে একাট্টা দলের অধিকাংশ নেতা। তাদের দাবি হাসানুল হক ইনু এতোদিন আওয়ামী লীগের ঘাড়ে ভর করে এমপি হয়েছেন। এবার ইনুকে নয়, নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে চান তারা। সব হিসেব নিকেশ কষে এবার কুষ্টিয়া-২ আসনে মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামারুল আরেফিনকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন। কামারুল আরেফিন দুই বারের উপজেলা চেয়ারম্যান। তিনি চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের বড় অংশের সমর্থন কামারুলের পক্ষে যাওয়ায় হাসানুল হক ইনু পড়েছেন বেকায়দায়।

কুষ্টিয়া-৩ (সদর): আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী মাহবুবউল আলম হানিফের কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে এবার বেশ প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত ২টি সংসদ নির্বাচনে হানিফের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও এবার প্রার্থী হয়েছেন কুষ্টিয়া পৌরসভার জনপ্রিয় মেয়র আনোয়ার আলীর পুত্র পারভেজ আনোয়ার তনু। তনু ক্রীড়া সংগঠক ও ব্যবসায়ী। তরুনদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা আছে। নেতা-কর্মিরা মনে করছেন, তণু প্রার্থী হওয়ায় এখানে হিসেব বদলে যেতে পারে। কারণ, ২০১৮ সালে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী দিলেও সেই প্রার্থী মাঠেই নামতে পারেনি। হামলা-মামলায় আক্রান্ত হয়ে ঘরে বসে থাকতে হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনএফ’র দুর্বল প্রার্থী ছিল নৌকার প্রতিপক্ষ। সেই তুলনায় তণু শক্ত প্রার্থী বলে মনে করছেন অনেকে। তণুর বাবা আনোয়ার আলী কুষ্টিয়া পৌরসভার ৫ বারের নির্বাচিত মেয়র। তিনি এ আসনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সামান্য ভোটে পারিজত হন। পৌর এলাকায় তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে। তার ছেলে হিসেবে যুব নেতা পারভেজ আনোয়ার তণু একটু বাড়তি সুবিধা পাবেন বলে মনে করছেন অনেকে। এছাড়া বিএনপি ও সমমনা দলের সমর্থকদের ও সমর্থন পাচ্ছেন তণু। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে এই সরকারের আমলে দেশের প্রায় সব জেলাতে তারা কর্মসূচি পালন করতে পারলেও এখানে তাদের ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয় না। কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করতে গিয়েও তারা বারবার বাঁধার মুখে পড়েছেন। এই পরিস্থিতির জন্য তারা মূলত মাহবুবুল আলম হানিফকে দায়ী করছেন। এ কারণে তারা মন্দের ভালো হিসেবে তণুকে বেছে নিতে চাইছেন। অন্যদিকে টানা দুবারের সাংসদ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এলাকায় তথা কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছেন, যা অন্য কারো সময় হয়নি। তবে নেতাকর্মীদের অভিযোগ, হানিফের আমলে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল তার চাচাতো ভাই সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতার। তিনি দলের ত্যাগীদের কোনঠাসা করে বিএনপি-জমায়াত ও হাইব্রীড নেতাদের কাছে টেনে নেন। এ কারনে শহর ও ইউনিয়নে দলটির অনেক নেতাকর্মির মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। এই সব নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে নৌকাকে সমর্থন দিলেও ভেতরে ভেতরে তারা তণুর পক্ষে কাজ করছেন বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে। এদিকে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে বার বার আচরণ বিধি লঙ্ঘন ও পারভেজ আনোয়ার তণুর প্রচারে বাধা এবং সমর্থকদের মারধরের অভিযোগ উঠছে। তবে এ আসনে এবার যেই নির্বাচিত হোক, লড়াই হবে সেয়ানে সেয়ানে।

কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী): কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী, আওয়ামীলীগ নেতা ও সাবেক এমপি আব্দুর রউফের পাল্লা দিন দিন ভারি হয়ে উঠছে। দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা আশির্বাদের হাত তুলে নেওয়ায় আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী বর্তমান এমপি সেলিম আলতাফ জর্জের অবস্থা বেশ টালমাটাল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোড় খাওয়া নেতাদের চমকে দিয়ে কুষ্টিয়া-৪ আসনে আওয়ামী লীগের টিকেট বাগিয়ে এমপি হন সেলিম আলতাফ জর্জ। স্থানীয় আওয়ামী রাজনীতিতে নতুন মুখ হলেও তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর গোলাম কিবরিয়ার নাতি। সেই সুবাদেই তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীও মনোনয়ন পেয়েছিলেন বলে স্থানীয় নেতাদের ধারণা। তবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কিছু বির্তকিত কর্মকান্ড এবং একলা চলো নীতির ফলে কুমারখালী ও খোকসা উপজেলার আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মীরা তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে তৃনমূল নেতা কর্মীদের দাবি। তাই গেল নির্বাচনে তিনি যেনতেন ভাবে পার পেলেও এবার এবার তিনি পড়েছেন তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে। এবার ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামীলীগ নেতা ও সাবেক এমপি আব্দুর রউফ। এখানে আব্দুর রউফের নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। এরই মধ্যে আব্দুর রউফের সমর্থনে দুই উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এক জোট হয়েছেন। এই কাতারে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক প্রবীন রাজনীতিক জাহিদ হোসেন জাফর, কুমারখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান খান, খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র তারিকুল ইসলাম তারিক, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খানের ছোট ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রহিম খান। দলের অধিকাংশ নেতা আব্দুর রউফের পক্ষ নেওয়ায় অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন সেলিম আলতাফ জর্জ। তবে এই আসনটিতে ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী সহিংসতা। প্রায় প্রতিদিনই নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সমর্থকদের মারপিটের পাল্টাপাল্টি ঘটনা ঘটছে আব্দুর রউফ ও সেলিম আলতাফ জর্জের সমর্থকদের মধ্যে।