কুষ্টিয়ার হানিফ ও আতা কমিশন বাণিজ্য করে দেশে-বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড় - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার হানিফ ও আতা কমিশন বাণিজ্য করে দেশে-বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তার চাচাতো ভাই কুষ্টিয়া শহর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। তিনি কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। আওয়ামীলীগ শাসনামলের গত ১৬ বছরে এই দুই ভাই মিলে কুষ্টিয়ার সব কিছু লুটেপুটে খেয়েছেন। ঠিকাদারী কাজ, হাট, ঘাট, বালু মহালসহ এমন কোন ক্ষেত্র নেই, যেখানে এই দুই ভাইয়ের দুর্নীতির নগ্ন থাবা বসেনি। কেবল সাধারণ মানুষই নয়, আওয়ামীলীগের ত্যাগি নেতারাও এই সময়ে হানিফ-আতার হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন।

কেবল দেশে নয়, বিদেশেও দুই ভাই বাড়ি গাড়ি কিনেছেন। আর তাদের এই কাজে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন জেলা পরিষদের সদস্য (ভাইস চেয়ারম্যান) জহুরুল ইসলাম এবং আতাউর রহমান আতার ম্যানেজার সরজিত। হানিফ এবং আতার অবৈধ আয়ের টাকা ভাগ বাটোয়ারা থেকে শুরু করে দেশে গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছে যেত জহুরুল এবং সরজিতের মাধ্যমেই। ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের অনান্য নেতাদের মত জহুরুল এবং সরজিতও গাঁ-ঢাকা দিয়ে পালিয়েছে।

তবে অনেকেই মনে করেন, জহুরুল এবং সরজিতকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সাবেক এমপি হানিফ এবং আতাউর রহমান আতার সমস্ত অবৈধ আয় সম্পর্কে সকল তথ্য পাওয়া যাবে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার মানুষ মাহবুব উল আলম হানিফ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আত্মীয়। সেই সূত্র ধরে হঠাৎ করে দলের নতুন মুখ হানিফ কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন।

২০০৮ এর সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে নির্বাচন করতে চাইলেও ওই আসন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ছেড়ে দেয় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। নির্বাচনের পর তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হন হানিফ। ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে সবগুলো সংসদ নির্বাচনে তিনি কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি হন তিনি। এরই মাঝে তিনি আওয়ামীলীগের কেন্দ্রিয় কাউন্সিলে দলের যুগ্ম সম্পাদক হন। এর পর থেকে তার আঙ্গুলের ইশারায় চলতে হতো কুষ্টিয়ার আওয়ামীলীগ নেতাদের। আওয়ামীলীগের ১৬ বছরের শাসনামলে ক্ষমতার দাপটে হানিফ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

কুষ্টিয়ার সব ঠিকাদারী কাজ, হাট ঘাটের ইজারা, সরকারী বেসরকারী অফিস আদালতে নিয়োগ, পদ্মা ও গড়াই নদীর বালু মহাল থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্র থেকে কমিশন আদায় করেছেন হানিফ। এমন কি আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের পদ বিক্রির অভিযোগও রয়েছে হানিফের বিরুদ্ধে। অবৈধভাবে অর্জিত টাকায় তিনি খুলনায় বিশাল মাছের ঘেরসহ নামে বেনামে বাড়ি ফ্লাট কিনেছেন। কানাডাতেও রয়েছে তার নিজস্ব বাড়ি। হানিফ কুষ্টিয়ার রাজনীতি ছাড়াও সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। এমনকি স্কুল কমিটির সভাপতি কে হবে সেটাও নির্ধারণ করে দিতেন হানিফ। তিনি এমপি হলেও মন্ত্রীর থেকে বেশি প্রটোকল পেতেন।

কুষ্টিয়ায় আসলে সামনে ও পেছনে থাকতো পুলিশের ভ্যান। এছাড়াও স্পেশাল সিকিউরিটি পেতেন তিনি। হানিফ কুষ্টিয়ায় আসলে ঘিরে রাখতেন ব্যবসায়ীদের একটি দল। তাদের কারনে দলীয় নেতা-কর্মিরা কথা বলার মত সুযোগও পেতেন না। কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে জমি কিনে ২০১৩ সালের দিকে তিন তলা বিলাশ বহুল বাড়ি নির্মাণ করেন। ঢাকায় থেকে এসে এ বাড়িতে বসেই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। দলের নেতাদের বাদ দিয়ে তিনি বিএনপি-জামায়াতপন্থি ব্যবসায়ী ও নেতাদের সাথে আঁতাত করে তাদের কাছে ভেড়ান। তাদের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে সব প্রতিষ্ঠান থেকে লুটে নেন কোটি টাকা।

বিশেষ করে খাজানগর এলাকার তিন জন চালকল মালিকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ফ্রেস এগ্রো ফুড, দেশ এগ্রোফুড, মেসার্স সুবর্না অটো মিলের মালিকের সাথে তার দহরম ছিল বেশি। একই সাথে কুষ্টিয়ায় খাদ্য সংগ্রহ থেকে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে বিগত ১৬ বছরে। এ টাকার বড় একটি অংশ দিয়ে কুষ্টিয়া শহরের এনএস রোডে আওয়ামীলীগের দলীয় অফিস নির্মাণ করেন হানিফ। একাধিক সুত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ভবন নির্মাণ প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা কমিশন বানিজ্য করেছেন হানিফ ও তার কয়েকজন দোসর।

তারা টেন্ডারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেন। এছাড়া কুষ্টিয়া শহরের ফোর লেন সড়ক নির্মাণ কাজের একটি প্যাকেজ হানিফের পার্টনার স্প্রেকটা লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ লাইসেন্সে হানিফ নিজেই কাজ করেন। সর্বশেষ জুন মাসের দিকে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় পদ্মা নদী শাসনে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের টেন্ডার হয়। এ টেন্ডার ভাগাভাগি হয় হানিফের ঢাকা অফিসে বসে। সেখানে হানিফ নিজেই ৫০০ কোটি টাকার কাজ নিজের কাছে রেখে বাকি কাজ স্থাণীয় অন্য এমপি ও নেতাদের মাঝে ভাগ করে দেন। পরে সেই কাজ বিতর্কিত ঠিকাদার ওয়েষ্ট্রার্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং এর কাছ থেকে মোটা অংকের কমিমশন নিয়ে বিক্রি করে দেন। তাতে শতাধিক কোটি টাকার কাছে কমিশন নেন হানিফ এমন বিষয় আলোচনা আছে সব খানে।

ঠিকাদারদের সুত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া মুজিব নগর সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পে গত ৪ বছরে কোটি কোটি টাকার ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে। সব কাজ ভাগা ভাগি করেছেন হানিফ ও তার ভাই আতাসহ আওয়ামীলীগের নেতারা। একই সাথে হানিফের ব্যবসায়ীক পার্টনার ও জেলা আওয়ামীলীগের কোষাধক্ষ্য অজয় সুরেকার মাধ্যমে দুবাইসহ কয়েকটি দেশে টাকা পাচার করার মত অভিযোগ আছে। যতি অজয় সুরেকা তা অস্বীকার করছে, এমনকি আওয়ামীলীগে হানিফ তাকে জোর করে পদ দিয়েছে বলেও দাবি করেছেন। বাইপাস সড়ক নির্মান প্রকল্প থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছেন হানিফ, এছাড়া জেলার যত অবৈধ বালু ঘাট তা নিয়ন্ত্রণ ছিলো হানিফ, আতার ও তার স্বজনদের নামে। বালু ঘাট থেকে শতশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে হানিফ ও আতা সম্পদ গড়েছেন কুষ্টিয়াসহ ঢাকা এবং দেশের বাইরে।

হানিফের নামে নিউজ করে মামলা ও হামলার স্বীকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। এর মধ্যে কুষ্টিয়া ছাড়া হয়েছে একাধিক সংবাদ কর্মি। এর আগে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠান যুগান্তর প্রতিনিধি এ এম জুবায়েদ রিপন, বাংলাভিশনের রিপোর্টার হাসান আলী, বর্তমানে সময় টিভি রাজশাহীতে কাজ করেন মওদুদ রানাকে (যমুনা টিভিতে কর্মরত ছিলেন)। এর বাইরে মুন্সী শাহীন আহমেদ ও অঞ্জন শুভ নামের দুই সাংবাদিক হানিফের রোসানলে পড়ে মিথ্যা মামলায় কারাগারে যান এবং এই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানি করা হয়। আতাউর রহমান আতা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ষোলদাগ গ্রামের প্রয়াত আব্দুস সাত্তারের ছেলে। আব্দুস সাত্তার আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের বাবা আফসার আলীর চাচাতো ভাই।

সেই সূত্রে হানিফ আর আতা চাচাতো ভাই। হানিফের পর আতা ছিলেন কুষ্টিয়ায় আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে দ্বিতীয় ব্যাক্তি। দুই ভাই মিলে জেলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। সব সরকারি কাজ ছিল তাদের নিয়ন্ত্রনে। এভাবে আতা জিরো থেকে বনে গেছেন শত কোটি টাকার মালিক। এক সময় একটি মটর সাইকেলে চড়লেও এখন তার কোটি টাকার দামি একাধিক গাড়ী আছে। স্ত্রী প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হলেও স্বামীর টাকায় সেও কোটিপতি ঢাকায় একাধিক ফ্লাট ও বাড়ি আছে আতার। হানিফ দলের যুগ্ম সম্পাদক হওয়ায় আতা ছিল সবার কাছে আতঙ্কের। দলমত নির্বিশেষে সবাই আতাকে সামাল দিয়ে চলতেন। বিচার ও শালিস থেকে সবখানে আতার কথায় ছিল শেষ কথা।

বিএনপির কয়েকজন নেতা ছিল আতার ঘনিষ্ঠ। তাদের মাধ্যমে ব্যবসা-বানিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। এমনকি সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের আগে হানিফের ভোটের কথা বলেও কোটি কোটি টাকা নেওয়া হয়। দলের নেতারা বলেন, কুরবানীর আগে গরু ও ছাগলও আসত উপহার হিসেবে। দেশ ছাড়াও দেশের বাইরে আতার সম্পদ ও অর্থ আছে বলে শোনা যায়। এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় আতার সেকেন্ড হোম আছে মনে করেন দলের অনেকে। আতার ঘনিষ্ট পৌর কাউন্সিলর মীর রেজাউল ইসলাম বাবুসহ বেশ কয়েকজনও টাকার মালিক বনে গেছেন।  তারাও আতার দাপট দেখিয়ে কাউকে মানুষ মনে করতেন না। যাকে-তাকে মারধর করতেন যখন তখন। আতা বাড়িতে থাকলেও সব সময় পাহারা থাকতো বাড়িতে। বাইরে বেরুলে গাড়ী আগে-পিছে বহর নিয়ে বেড়াতেন। দলের পদ-পদবি ও টেন্ডারে কাজ পেতে আতার কাছে ধরনা দিতে হতো সবাইকে।

তার অত্যাচার ও নির্যাতনে দল ছেড়েছেন অনেকে। এমনকি ঠিকাদারি কাজও ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন। অবৈধ বালু ঘাট, হাট-বাজার, বিল ও বাউড় নিয়ন্ত্রণ করতেন আতা। তিনি এভাবে গত ১৬ বছরে শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। হাসিনা পালিয়ে যাবার পর আতা গা ঢাকা দিয়েছেন। তার বাড়ি লুটপাট হয়ে গেছে। একই অবস্থা হানিফের বাড়িরও। আতার স্ত্রীর নামে অবৈধ সম্পদের অভিযোগে দুনীতি দমন কমিশন মামলা করেছে। আতার অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে। যে কোন সময় মামলা হতে পারে বলে জানা গেছে। জেলা আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আতা ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত ভেড়ামারায়ই ছিলেন। সেখানে ঠিকাদারীর পাশাপাশি সেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের রাজনীতি করতেন। তবে কোনও পদে ছিলেন না।

হানিফ ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে মনোনয়ন পাওয়ার আগে শহরের পিটিআই রোডে জমি কিনে বাড়ির কাজ শুরু করেন। আতাকে এ সময় মূলত ওই বাড়ির কাজ-কর্ম দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। জেলা আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা জানান, হানিফ সদর আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর আতাকে তার স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আতা শহরের রাজনীতি শুরু করেন। শহর আওয়ামীলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোমিনুর রহমান মোমিজ এক ঘটনায় বহিষ্কার হওয়ার পর আতাকে হুট করেই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এরপর সর্বশেষ ২০১৯ সালের কাউন্সিলে ভারমুক্ত হন তিনি। সেই কাউন্সিলের পর আর কাউন্সিল হয়নি। ২০১৯ সালের সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় টিকিটও পেয়ে যান আতা। এরপর তার বিরুদ্ধে কেউ নির্বাচন করতে আর সাহস করেনি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় তিনি সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন। শহর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক, সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং সদর আসনের সংসদ সদস্য হানিফের চাচাতো ভাই ও স্থানীয় প্রতিনিধি- এসব পরিচয় আতার জন্য স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকে সহজ করে দেয়। দিন দিন বাড়তে থাকে তার প্রভাব, দলীয় নেতাকর্মীরাও আসতে থাকেন তার কাছে। অল্প দিনেই শহর ও সদরের রাজনীতিতে তৈরি করেন নিজস্ব বলয়। অভিযোগ আছে, পুরো জেলা আওয়ামীলীগের রাজনীতিই হানিফ নিয়ন্ত্রণ করতেন আতার মাধ্যমে।

এর পর অর্থ-বিত্তে-সম্পদে ফুলে ফেঁপে ওঠে আতাউর রহমান আতা। ২০২২ সালে আতার বিপুল অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তি তুলে ধরে দুদকে একটি অভিযোগ জমা পড়ে। এতে বলা হয়, ১০ বছরের ব্যবধানে ভাই হানিফের প্রভাব আর আওয়ামীলীগের পদ-পদবি ব্যবহার করে বাড়ি-গাড়িসহ ১১০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন আতা। এই অভিযোগ উঠার পর ২০২২ সালে দুদক আতার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে। আতা জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ কুষ্টিয়া অফিস থেকে সাড়ে ৫ কাঠার প্লট নিয়েছেন। শহরের হাউজিং এলাকায় ওই জমিতে ৭ তলা ভবনের কাজ চলছে। স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রীর নামে তিনি ওই সম্পদ করেছেন।

এখানে বিনিয়োগের ব্যাপারে আয়কর নথিতে দেখানো হয়েছে মাত্র ৭৫ লাখ টাকা। অথচ ভবন করতেই খরচ হয়েছে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা বলে আতা ঘনিষ্ঠ এক আওয়ামীলীগ নেতা দাবি করেছেন। এছাড়া কুষ্টিয়া হাই স্কুল মার্কেটে ১২টি, পরিমল টাওয়ারে দুটি ছাড়াও জেলা পরিষদ মার্কেট, সমবায় মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে তার একাধিক দোকান আছে। শহরের বটতৈল এলাকায় জেলা পরিষদ মার্কেটের আটটি দোকান নিজ ও স্ত্রীর বরাদ্দ নিয়েছেন। একই মার্কেটে আরও চারটি দোকান আত্মীয়-স্বজনের নামে বরাদ্দ নিয়েছেন। ভেড়ামারায় ২৫ বিঘা জমি কিনে বাগান করেছেন। এছাড়া ২৪ শতাংশ জমি রয়েছে আতার।

আতার নামে ব্যাংক এশিয়ার পাংশা, রাজবাড়ী শাখায় ২ কোটি টাকার ডিপোজিট রয়েছে এক হিসাবে। ব্যাংক এশিয়া কুষ্টিয়া শাখায় আতার চলতি হিসাবে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়। পূবালী ব্যাংক কুষ্টিয়া শাখায় হিসাব রয়েছে আতার, যেখানে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ডিপোজিট রয়েছে। উত্তরা ও রূপালী ব্যাংক কুষ্টিয়া শাখায় আতার নামে ডিপোজিট আছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক কুষ্টিয় শাখা আতার স্ত্রী সাম্মিয়ারার নামে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ডাবল বেনিফিট স্কিম, ন্যাশনাল ব্যাংক কুষ্টিয়া শাখা সমপরিমাণ টাকার ডাবল বেনিফিট স্কিম ডিপোজিট রয়েছে। আতা ঢাকার গুলশানে ৪০০০ বর্গফুটের একটা ফ্ল্যাট কিনেছেন, যার মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা।

এসব সম্পদ ছাড়াও কুষ্টিয়া শহরের কয়েকটি বহুতল ভবনে একাধিক ফ্লাট ছাড়াও নামে-বেনামে তার সম্পদ রয়েছে নানা জায়গায়। আতা ভেড়ামারা উপজেলায় আরও দুটি অংশে ১৫.১৮ শতাংশ জমি কিনেছেন, যার মূল্য ৬০ লাখ টাকার বেশি। আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর হানিফ ও আতার বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ায় দায়ের করা হয়েছে একাধিক হত্যা মামলা। তারা দুজনেই আত্মগোপনে রয়েছেন। সরকার পতনের পর মাহবুব উল আলম হানিফের কুষ্টিয়ার আলিশান বাড়িতে হামলা করে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ উগরে দেয় ছাত্র জনতা। বাড়ির জানালা দরজা থেকে শুরু করে সব ফার্নিচার লুট হয়ে গেছে। এমনকি জালনা সহ বিভিন্ন জায়গার গ্রিল খুলে নিয়ে গেছে ক্ষুব্ধ লোকজন। এই ভুতুড়ে বাড়ি দেখতে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখন ভিড় করছেন মানুষ।