কুষ্টিয়ার মোকামে উঠতে শুরু করেছে নতুন আমন ধান - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার মোকামে উঠতে শুরু করেছে নতুন আমন ধান

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: নভেম্বর ২২, ২০২৪

নিজ সংবাদ ॥ দেশের বিভিন্ন জেলায় মোকামে উঠতে শুরু করেছে নতুন আমন ধান। এর প্রভাবে কৃষক পর্যায়ে ধানের দাম কমতেও শুরু করেছে। কিন্তু ধানের দাম কমার প্রভাব পড়েনি চালের বাজারে। কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মোকামে উঠতে শুরু করেছে নতুন আমন ধান। এর প্রভাবে কৃষক পর্যায়ে ধানের দাম কমতেও শুরু করেছে। কিন্তু ধানের দাম কমার প্রভাব পড়েনি চালের বাজারে। কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, নওগাঁসহ বেশ কয়েকটি জেলায় চালের বাজার এখনো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, আমন ধান চাল হয়ে বাজারে আসতে সপ্তাহ দুয়েকের মতো সময় লাগবে।

এরপর চালের দাম কমতে পারে। কুষ্টিয়ার খাজানগরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন ধান ওঠায় গত এক সপ্তাহে কৃষক পর্যায়ে ধানের দাম মণপ্রতি কমেছে ৫০-৮০ টাকা। কিন্তু চালের বাজারে দাম কমেনি। কোথাও কোথাও বাড়ার অভিযোগও আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাজানগরে চালের বাজারে অস্থিরতার পেছনে রয়েছে পুরনো সিন্ডিকেট, মিল মালিকরা যার প্রধান অনুঘটক। বিভিন্ন সূত্র জানায়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে ১১ মিল মালিকের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। বিগত সরকারের ছত্রছায়ায় চালের দাম নিয়ে রাজত্ব করেছেন তারা। বর্তমানেও ধান-চালের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই। খাজানগরে রয়েছে অর্ধশত অটো রাইস মিল। রাজধানী ঢাকার বাজারে যে মিনিকেট চাল পাওয়া যায়, তার বড় অংশ আসে কুষ্টিয়ার ৩১ স্বয়ংক্রিয় বা অটো রাইস মিল থেকে। কিন্তু ১১ মালিকের হাতেই থাকে পুরো খাজানগরের নিয়ন্ত্রণ। দেশ এগ্রো ফুডের মালিক আব্দুল খালেক বলেন, ‘দেশের চালের বাজার খাজানগর থেকে নিয়ন্ত্রণ হয় না।

এটি নিয়ন্ত্রণ করে দেশের ১০টি করপোরেট কোম্পানি। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কুষ্টিয়ার বিএনপি নেতা ও কুষ্টিয়া অটো মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, ‘কয়েক দিন হলো নতুন ধান উঠতে শুরু করেছে। এ পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে ৪০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান উঠলে চালের দাম কমে যাবে। কুষ্টিয়ার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান সিন্ডিকেটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘খাজানগরের কয়েকটি মিলে বিপুল পরিমাণ ধান-চাল মজুদ রয়েছে। ছোটখাটো অভিযান চালিয়ে কোনোভাবেই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব না। সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে বড় ধরনের অভিযান চালাতে হবে। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘জেলা প্রশাসন সবসময়ই তৎপর রয়েছে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। মিল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়। তিনি আরো বলেন, ‘নতুন ধান মাড়াই করে চাল পর্যন্ত পৌঁছতে কয়েক দিন সময় লাগে।

এ চাল বাজারে উঠলে দাম কমে যাবে। দিনাজপুরেও আগাম জাতের ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হয়েছে। বাজারে তিনটি জাতের ধান আসতে শুরু করেছে। এর মধ্যে স্বর্ণা এক বস্তা ধান (৭৫ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬৫০ টাকায়, ব্রি২৮ ৩ হাজার ২৫০ ও মিনিকেট ৩ হাজার ৩০০ টাকায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে ধানের সরবরাহ বাড়লেও চালের দামে খুব একটা প্রভাব পড়েনি। দিনাজপুর শহরের পুলহাট, বাহাদুরবাজার, চকবাজার, শিকদারহাটের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৫ দিন আগে ৫০ কেজির এক বস্তা স্বর্ণা চাল বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। বর্তমানে প্রতি বস্তা তাদের কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৭৫০ টাকায়। ব্রি২৮ ও ব্রি২৯ চাল ৫০ কেজির বস্তার দাম ১৫ দিন আগে ছিল ২ হাজার ৭৫০ টাকা। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৫৬ টাকায়। বর্তমানে সে চাল প্রতি বস্তা মিল গেটে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার আর খুচরায় প্রতি কেজি ৬২ টাকায়। ৫০ কেজি মিনিকেট চালের দাম ছিল ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকা। প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৬৪ টাকায়। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে প্রতি বস্তা সাড়ে ৩ হাজার আর খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ৭৩ টাকায়। কেজিতে দাম বেড়েছে ৯ টাকা।

নাজিরশাইল প্রতি বস্তা বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। বর্তমানে তা ৪ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ব্যাপারে দিনাজপুর চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমন ধান ওঠার আগে প্রতি বছর চালের দাম বাড়ে। বাজারে ধানের দামের ওপর চালের দাম নির্ভর করে। অন্য বছরের চেয়ে এবার বাজারে ধানের দাম বেশি। সে অনুযায়ী চালের দামও বেড়েছে। এখানে মিল মালিকদের কিছু করার নেই। চালের দাম না কমার কারণ জানতে চাইলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুবীর নাথ চৌধুরী বলেন, ‘দিনাজপুরে চিকন সুগন্ধি ধান আবাদ বেশি হয়। এ কারণে মোটা চালের দাম বেশি। বাজারে কাটারী, চিনিগুঁড়া বা শম্পা কাটারী জাতের সুগন্ধি চিকন চালের দাম বাড়েনি, বরং কমেছে। নতুন আমন ধান বাজারে আসা শুরু হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে চালের দাম কমে যাবে। দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দিনাজপুরে ২ লাখ ৮৫৬ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে।

এর মধ্যে ৯৫ হাজার ৬০২ হেক্টর জমিতে চিনিগুঁড়া ও কাটারী জাতের চিকন সুগন্ধি এবং অবশিষ্ট ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে ব্রি২৮, ২৯, ১৬, স্বর্ণা, হাইব্রিডসহ উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষ হয়েছে। আগাম জাতের ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হয়েছে। ১২ নভেম্বর পর্যন্ত ৫৮ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান কাটা ও মাড়াই শেষ হয়েছে বলে জানান কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আনিসুজ্জামান। এদিকে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে নওগাঁয় পুরোদমে আমন ধান মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয় হাটগুলোয় বেড়েছে নতুন ধানের সরবরাহ। তবে ধানের দাম খুব একটা কমেনি। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ১ হাজার ৩৮০ থেকে ১ হাজার ৪২০ টাকা, ব্রি৪৯ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৪০ এবং গুটি স্বর্ণা ও মামুন স্বর্ণা ১ হাজার ৩৩০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা মণ দরে কেনাবেচা হচ্ছে। নওগাঁ শহরের সততা রাইচ এজেন্সির স্বত্বাধিকারী সুকুমার ব্রহ্ম বলেন,

‘এ বছর সংগ্রহ অভিযানে সরকার এরই মধ্যে কৃষকদের থেকে প্রতি কেজি ধান ৩৩ টাকা অর্থাৎ ১ হাজার ৩২০ টাকা মণ দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়ায় আগামীতে ধান বা চালের দাম নতুন করে আর বাড়ার সম্ভাবনা নেই। সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘দেশের কয়েকটি জেলায় বন্যায় এবার আমন ধানের ফলন কম হয়েছে। এর প্রভাবে প্রতি মণ ধানের দাম ১০০ টাকা বেড়েছে। উৎপাদন ঘাটতির দিক বিবেচনায় ধানের এ মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক কিছু নয়।