কুষ্টিয়া সদরের পাটিকাবাড়ী এবং মিরপুর উপজেলার হালসা পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছে এলাকাবাসী। অন্যদিকে পুলিশের চাঁদাবাজি থেকে রক্ষাপেতে সড়ক দূর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসিব (২৪) নামের এক যুবক শুক্রবার (২৬ জানুয়ারি) প্রাণ হারিয়েছে বলে জানা গেছে। কুষ্টিয়া জেলাব্যাপি আলোচিত একটি নাম হলো কুষ্টিয়া সদরের পাটীকাবাড়ি ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের নলকোলা গ্রাম ও আইলচারা ইউনিয়নের হঠাৎ পাড়ার মধ্যে নলকোলা স্টীল ব্রিজের নাম শোনেনি এমন মানুষ কুষ্টিয়াতে পাওয়া দুষ্কর। এই ব্রিজের নাম বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপকর্মের কারণে বারবার খবরের শিরোণাম হয়েছে। কখনও এই ব্রিজের আশে পাশে পাওয়া গেছে অজ্ঞাত বা জ্ঞাত মানুষের লাশ। আবার কখনও এই ব্রিজের নাম খবরের শিরোণাম হয়েছে ডাকাতি ও লুটপাটের কারণে।

এক সময়ের এই বহুল আলোচিত ব্রিজে প্রতি বছরের কোন না কোন ঘটনা ঘটেই থাকে। যার প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে ঐ এলাকার শান্তি বজায় রাখার জন্য এলাকাবাসী এবং কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় ব্রিজের সম্মুখে বিশেষ পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। আর সেই কারণে শীত এবং বৃষ্টি থেকে পাহারারত পুলিশ সদস্যদের রক্ষা করতে ২০০৮ সালে ব্রিজের পাশেই এলাকাবাসীর অর্থায়নে পুলিশ সদস্যদের বসার জন্য একটি ওয়াল পাকা টিনের দোচালা ঘর তৈরিও করা হয়। তারপর থেকে জেলা পুলিশের নির্দেশনায় কুষ্টিয়া সদরের নাজিরপুর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা এবং পাটীকাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাতে নিয়মিত পাহারায় থাকতো। সেই সময় ঐ এলাকায় ডাকাতি শূণ্যের কোটায় নেমে আসে। এরপর মাঝখানে সেই পাহারা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে আবারো শুরু হয় পূর্বের সমস্ত অপকর্ম। সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে রাতে আবারো শুরু হয় পুলিশি পাহারা। যার ফলে বর্তমানে রাতে চলাফেরা করতে খুব একটা সমস্যা হয় ঐ এলাকার মানুষের। কিন্তু রাতে পুলিশ সদস্যরা পাহাদারের ভূমিকায় থাকলেও দিনের বেলা দেখা যায় তার উল্টো চিত্র। বিশেষ করে কুষ্টিয়া সদরের পাটীকাবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ও মিরপুর উপজেলা হালসা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মোটর সাইকেল, অটো রিক্সা ও অন্যান্য যানবাহন ঠেকিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুর আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদরের তালতলা গ্রামের দুলুর ছেলে আকিব (২০) এবং নজরুলের ছেলে হাসিব (২৪) কুষ্টিয়া মোটরসাইকেল যোগে নিজ বাড়ীতে ফেরার সময় স্টীল ব্রিজের সামনে পৌঁছালে উপস্থিত হালসা পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা তাদেরকে মোটরসাইকেল থামানোর জন্য নির্দেশনা দেয়। সেই সময় তারা মোটরসাইকেল না থামিয়ে উল্টো পথে (কুষ্টিয়ার দিকে) চলা শুরু করলে পুলিশের দুইজন সদস্য তাদেরকে ধাওয়া করে এবং আইলচারা ইউনিয়নের বাগডাঙ্গার উসার গ্যাপে তাদের মোটর সাইকেল অপর দিক থেকে আসা (ঢাকা মেট্রো-ছ-৭১২৩৯২) এ্যাম্বুলেন্সের সাথে ধাক্কা খায়। নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার হাসিব ও আকিব চুয়াডাঙ্গা থেকে মোটরসাইকেলযোগে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আইলচারা ইউনিয়নের বল্লভপুর মাঠপাড়া এলাকায় তাদের চাচাতো বোনের ছেলের সুন্নতে খতনার অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। শুক্রবার দুপুরে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে স্টীল ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে পুলিশের একটি দল তাদের থামতে বলা হয়। কিন্তু তাদের মোটরসাইকেলের লাইসেন্স না থাকায় তারা পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় বাগডাঙ্গা উসার গ্যাপ নামক স্থানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীতগামী একটি অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল এবং এ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে মোটর সাইকেলটি ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে যায়। এছাড়াও এ্যাম্বুলেন্সটি সড়কের পাশে থাকা বেশ কয়েকটি সুরক্ষা পিলার উপড়ে নিয়ে প্রধান সড়কের কিছুটা নিচে নেমে যায়। ঘটনার সাথে সাথেই এলাকাবাসীর সহযোগিতায় দূর্ঘটনার শিকার মোটরসাইকেলের চালক হাসিব এবং আকিবকে অটোরিক্সা যোগে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে প্রেরণ করেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর সাথে সাথে কর্তব্যরত চিকিৎসক হাসিসকে মৃত হিসাবে ঘোষণা করেন এবং আকিব বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষ এই ঘটনার জন্য সাইকেল, অটো রিক্সা ও অন্যান্য যানবাহন ঠেকিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজিকে দায়ী করেন। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে সেইসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে জানানো হয়েছে। উপস্থিত সাধারন জনগণ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঐ ব্রিজের সামনে কুষ্টিয়া সদরের পাটিকাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি ও মিরপুর উপজেলার হালসা পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা বিভিন্ন যানবাহন ঠেকিয়ে অবৈধ ভাবে চাঁদাবাজি করে আসছে। তবে গত তিন মাসের অধিক সময় ধরে সেই চাঁদাবাজির মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখানে পুলিশের চাঁদাবাজির ধরণ অন্যরকম। যদি কোন মোটরসাইকেল চালক চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষাপেতে গাড়ী দ্রুত চালিয়ে চলে যেতে চান, তাহলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাকে ধাওয়া করে ধরে নিয়ে এসে তার কাছ থেকে টাকা নেয়। এখানে এমনও উদাহরণ আছে গাড়ীর কাগজপত্র ঠিক থাকলেও বিভিন্ন অযুহাতে টাকা আদায় করা হয়। নলকোলা মোড়ের মুদি দোকান ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান বলেন, কিছুদিন আগে হালসা ফাঁড়ির পুলিশে আমার মোটরসাইকেল থামিয়ে বিনাকারণে এক প্যাকেট ব্যানসন সিগারেট নেয়। এর আগে আমাদের গ্রামের লালন ও এনামুলের কাছ থেকেও নিয়েছে। কুষ্টিয়া এ্যাম্বুলেন্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও দূর্ঘটনায় কবলিত এ্যাম্বুলেন্সের মালিক সজল বলেন, মোটরসাইকেল ধরার জন্য ব্রিজের সামনে থেকে ধাওয়া দিলে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এখানে এসে এ্যাম্বুলেন্সের তলে পড়ে। এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার সহ দুই জন আহত অবস্থায় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান। বড় আইলচারা গ্রামের নাসির জানান, তিন মাসের বেশী সময় ধরে পুলিশ এখানে যাহবাহনের কাগজ চেক করার নামে চাঁদাবাজি করে। আজ পর্যন্ত কাগজপত্র চেক করে পুলিশ কাউকে কোন মামলা দেইনি। আসলে তারা টাকা নেওয়ার জন্যই এই কাজ করে। নলকোলা গ্রামের মোবারক হোসেন জানান, এখানে পুলিশ প্রতিদিনই এই কাজ করে এক দিনও কামাই (বন্ধ) নেই। উপস্থিত এলাকাবাসী বলেন, পুলিশের কাজ যানবাহনের কাগজ পত্র চেক করা না। যানবাহনের কাগজ চেক করার জন্য ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ আছে। আসলে এখানে কাজগপত্র চেক করার নামে চাঁদাবাজি করা হয়। কিন্তু স্থানীয় কোন জন প্রতিনিধি বা সাধারণ মানুষ প্রশাসনের ভয়ে কোন কিছু বলতে পারে না। আমরা এর প্রতিকার চাই। ফাঁড়ির পুলিশ যানবাহনের কাগজ চেক করতে পারবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ লিয়াকত আলী বলেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া কোন ফাঁড়ির পুলিশ যানবাহনের কাগজ চেক করতে পারবে না। তবে যদি কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেয় সেই ক্ষেত্রে পারবে। পাটিকাবাড়ী ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন নুরুল বলেন, এখানে যা হয় ভাষায় প্রকাশ করার মত না। গত তিন মাস পুলিশের এই অপতৎপরতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রতিকার হওয়া দরকার। সেই সাথে দোষীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। যানবাহন ঠেকিয়ে অর্থ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে পাটিকাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির আইসি এসআই সঞ্জয় মন্ডল জানান, আমাদের কোন সদস্য ঐখানে চেকপোষ্ট করে না। তবে যেহেতু ঐখানে তিনটা থানার সীমানা, ঐখানে আনসার ফাঁড়ি, সদর থানা বা হালসা ফাঁড়ি চেকপোষ্ট করতে পারে। মাঝে মাঝে ডিবি পুলিশ ওখানে চেকপোষ্ট করে। পাটিকাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ি কখনো ওখানে চেকপোষ্ট করে নাই। তবে এই বিষয়ে জানতে হালসা পুলিশ ফাঁড়ির সরকারী মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার ফোন দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। গতকালের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোস্তফা হাবিবুল্লাহ বলেন, ঐ জায়গার পাটিকাবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা এবং হালসার পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা দায়িত্ব পালন করে। তবে যানবাহনের কাগজপত্র চেক করার নামে টাকা নেওয়ার বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টা আমি খোঁজ খবর নিয়ে দেখছি। সার্বিক জানতে চাইলে ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মামুনুর রহমান বলেন, পাটিকাবাড়ী ফাঁড়ির পুলিশ ঐখানে রাতে ডিউটি করে। আমি এই বিষয়ে অবগত নই। বিষয়টি আমি আপনাদের মাধ্যমে জানলাম। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
