কুষ্টিয়ার তিলের খাজা
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় কিছু নির্দিষ্ট খাবার রয়েছে যা সেই অঞ্চলের নিজস্ব পরিচয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন বগুড়ার দই, মেহেরপুরের মিষ্টি প্যাড়া, চুয়াডাঙ্গার মসলা চিপস, রাজশাহীর আম কিংবা নরসিংদীর লেবু। সেই ধারাবাহিকতায় কুষ্টিয়ার নাম এলেই যে খাবারটির কথা প্রথমেই মাথায় আসে, সেটি হলো—তিলের খাজা।
তিলের খাজা শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়—এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক চিহ্ন, একটি স্বাদের ঐতিহ্য এবং বহু মানুষকে জীবিকা দানকারী ক্ষুদ্রশিল্প। শত বছরের এই স্বাদ এখনও কুষ্টিয়ার প্রতিটি স্টেশনে, হাটে, ফেরিওয়ালার ঝুলিতে কিংবা পর্যটকের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। আজ সেই তিলের খাজার গল্পই বলা হবে—যা একদিকে ঐতিহ্য, অন্যদিকে সম্ভাবনার দ্বার।
তিলের খাজার উৎপত্তি কবে এবং কীভাবে—এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নথিপত্র না থাকলেও জনশ্রুতি ও দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অভিজ্ঞতাই একে ইতিহাসে স্থান দিয়েছে। স্থানীয় প্রবীণরা জানান, উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের শুরুতে কুষ্টিয়ার দেশওয়ালী পাড়ায় প্রথম এই খাজা তৈরি শুরু হয়। সেই সময় পাল সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার মিষ্টান্ন তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন। তারা তিল, চিনি ও ঘন দুধ ব্যবহার করে খাজার আদলে এক নতুন ধরনের মিষ্টি তৈরি করেন।
পরে এই উদ্যোগে যুক্ত হন তেলি সম্প্রদায়ের কারিগররা, যারা মূলত তিলের তেল তৈরিতে অভিজ্ঞ ছিলেন। তিলের সহজলভ্যতা এবং স্বাদে ভিন্নতা আনতে তাঁরা চিনির সঙ্গে তিলের মিশ্রণ ঘটিয়ে নতুনভাবে খাজা তৈরি করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পণ্য স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে কুষ্টিয়ার হাটবাজার, মেলা এবং রেল স্টেশনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
একসময় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খামারে কর্মরত কিছু ভারতীয় তেলি পরিবার কুষ্টিয়ায় এসে এই খাজা তৈরির পদ্ধতি রপ্ত করে নেয়। যদিও পরবর্তীকালে দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধের পর সেই পরিবারগুলোর অনেকেই কুষ্টিয়া ত্যাগ করে, তবে তাদের রেখে যাওয়া কৌশল রয়ে যায় স্থানীয় কারিগরদের হাতে।
তিলের খাজা দেখতে অনেকটা ছোট ছোট ফাঁপা বালিশ বা বাতাসভর্তি মিষ্টির মতো। তবে এটি রসালো বা আঠালো নয়, বরং মচমচে ও হালকা। মুখে দিলে আস্তে আস্তে গলে যায় এবং চিনির সঙ্গে মিশে থাকা তিলের স্বাদ জিভে চমৎকারভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এর মূল আকর্ষণ তিনটি বিষয়ের কারণে:
তিলের খাজার এই বিশেষ গঠনের জন্য প্রয়োজন হয় নিখুঁত সময়জ্ঞান, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং হাতের জাদু। তাই এই মিষ্টি তৈরির জন্য শুধু উপকরণ থাকলেই চলে না—চাই অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং কঠোর পরিশ্রম।
তিলের খাজা মূলত তৈরি হয় পাঁচটি উপকরণ দিয়ে—
প্রক্রিয়াটি সাধারণত নিম্নরূপ:
তিলের খাজা একসময় শুধুমাত্র স্থানীয় চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে তৈরি হতো। তখন এটি মিলত শুধুমাত্র কুষ্টিয়া শহর বা আশপাশের হাটবাজারে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই পণ্যের স্বাদ ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চল, এমনকি দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও। এখন রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর এমনকি পার্বত্য অঞ্চলেও কুষ্টিয়ার তিলের খাজার সরবরাহ আছে।
তিলের খাজা সারা বছর তৈরি হলেও শীত মৌসুমে এর চাহিদা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। কারণ শীতকালে পিঠা, গুড়, তিল এবং শুকনো মিষ্টির প্রতি বাঙালির ঝোঁক বাড়ে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে খাজার মূল মৌসুম। তবে এ ছাড়া এপ্রিল-জুলাই মাসে ঈদ ও অন্যান্য উৎসব ঘিরেও বাজারে খাজার চাহিদা দেখা যায়।
কুষ্টিয়ার খাজা শুধু দোকানে সীমাবদ্ধ নয়। ফেরিওয়ালার ঝুলিতে ঝুলে বেড়ানো এই খাজা একসময় ছিল চলন্ত ট্রেন ও স্টেশনের এক অপরিহার্য দৃশ্য। ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়ানো খাজাওয়ালাদের আহ্বান—“খাজা লইন ভাই, কুষ্টিয়ার খাজা!”—এখনো অনেকের কানে বাজে।
এমনকি এই খাজার জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, অনেক সময় হকারদের বেশি হাঁকডাক দেওয়ার দরকারই পড়ত না। কেবল কাগজে মোড়া ছোট প্যাকেট, সামান্য দাম আর একবার খেয়ে মনভোলানো স্বাদই যথেষ্ট ছিল ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে।
ফেরিওয়ালাদের অধিকাংশই খাজার কারখানাগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কারখানায় রাতভর খাজা তৈরি হয়, আর পরদিন ভোরে খাজা বহনকারী ফেরিওয়ালারা বেরিয়ে পড়েন বিক্রির উদ্দেশ্যে। রেলওয়ে স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, মেলা বা ধর্মীয় উৎসবে এদের সরব উপস্থিতি আজও দেখা যায়।
বাংলাদেশ সরকার কুষ্টিয়ার তিলের খাজাকে ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। এর মাধ্যমে কুষ্টিয়ার এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এর উৎপত্তি ও স্বাদকে সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে, এই স্বীকৃতির পরও এখনও যথাযথ বাণিজ্যিক সুযোগ ও প্রসার নিশ্চিত হয়নি। স্থানীয় কারিগররা জানান, জিআই ট্যাগ থাকলেও তাঁরা এখনো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
তিলের খাজার প্রসারে এখনও কিছু বড় বাধা রয়ে গেছে:
তবে আশার খবর হলো, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপের ঘোষণা এসেছে। কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোছা. শারমিন আখতার জানান—
“তিলের খাজা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আমাদের জন্য গর্বের। এর সুনাম রক্ষায় জেলা প্রশাসন কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করছে।”
তিনি আরও জানান, স্থানীয় কারিগর, মালিক ও ফেরিওয়ালাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন পরিকল্পনা গড়ে তোলা হবে।
তিলের খাজার উৎপত্তি, ইতিহাস, স্বাদ এবং বাজার—সব মিলিয়ে এটি একটি সম্পূর্ণ ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন—
বিশ্বজুড়ে এখন লোকজ খাবারের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কুষ্টিয়ার তিলের খাজা তার স্বাদ, ঐতিহ্য ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য দিয়ে খুব সহজেই আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে। এটি শুধু খাবার নয়, বরং কুষ্টিয়ার স্মৃতি, মাটি ও মানুষের পরিশ্রমের প্রতীক।
তিলের খাজা কেবল কুষ্টিয়ার একটি মিষ্টান্ন নয়, এটি একটি ইতিহাস, একটি পেশা, একটি জীবিকা, একটি সংস্কৃতি। শতবর্ষ ধরে টিকে থাকা এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যটি আজও মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, আর কারিগরের হাতে এনে দেয় জীবনের স্বাদ।
সার্বিক উদ্যোগ, সরকারি সহায়তা এবং বাজার কৌশলের মাধ্যমে কুষ্টিয়ার তিলের খাজা হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ লোকজ ব্র্যান্ড। একে শুধু সংরক্ষণ নয়, উদযাপন করাও সময়ের দাবি।
📍 কুষ্টিয়ায় গেলে “তিলের খাজা” অবশ্যই খেতে ভুলবেন না। একবার চেখে দেখলেই বুঝবেন—কেন শতবর্ষ ধরে এই খাবার এতটা জনপ্রিয়!
