বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের কুখ্যাত প্রতারক, দেহ ব্যবসায়ী ও মাদক ব্যবসায়ী রেবা খাতুন (৪২) সহ তার এক সহযোগীকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশের একটি চৌকস দল। গত ২৬ জুন বুধবার রাত ১০ টার দিকে কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড় সংলগ্ন করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিস পূর্ব পার্শ্বে জিকে কলোনীর পরিত্যক্ত একতলা বিল্ডিং এর পাশে থেকে রেবা খাতুন ও তার সহযোগী মাদক ব্যবসায়ী ইমন ইসলাম(২৮) কে ৩০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।
রেবা খাতুন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল উত্তরপাড়া এলাকার মৃত মোমিন শেখের স্ত্রী। অপর আসামী ইমন ইসলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মোল্লাতেঘরিয়া এলাকার মৃত ইউনুস আলীর ছেলে। গ্রফতারকৃত রেবা খাতুন কুষ্টিয়া অঞ্চলের একজন কুখ্যাত প্রতারক, দেহ ব্যবসায়ী ও মাদক ব্যবসায়ী। এই ঘটনায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় ২০১৮ সনের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনের ৩৬(১) সারনির ১০(ক) ধারায় মামলা দায়ের করেছে ডিবি। মামলা নং- ৩৩/২৫১, তারিখ-২৭/০৬/২০২৪ ইং। অভিযানের নেতৃত্বে দেন কুষ্টিয়া ডিবি পুলিশের এসআই মোঃ আলহাজ আলী সঙ্গীয় ফোর্স।
রেবা খাতুন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল উত্তরপাড়া এলাকার মৃত মোমিন শেখের স্ত্রী। বেশ কয়েক বছর আগে রেবা খাতুনের স্বামী মৃত্যুবরন করলে রেবা খাতুন দেহ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। দেহ ব্যবসার পাশাপাশি মাদকের ব্যবসায়ও করে আসছিলো এই নারী। রেবা খাতুনের একমাত্র মেয়ে ফারহানা আক্তার ওরফে পায়েলকেও হ্যানিট্রাপ হিসেবে ব্যবহার করে অসংখ্য মানুষের কাছে থেকে ব্লাকমেইল করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। ২০২২ সালের ১২ জুলাই কুমারখালী উপজেলার এক ব্যক্তির বাড়ি থেকে দেহ ব্যবসার কাজে লিপ্ত থাকায় অন্তরঙ্গ অবস্থায় স্থানীয়দের কাছে আটক হয় রেবা খাতুন ও স্থানীয় এক যুবক।
স্থানীয় অপর এক যুবকের ধারণ করা ভিডিও থেকে দেখা যায়, রেবা খাতুন একটি কক্ষে এক ব্যক্তির সাথে সময় কাটানোর সময় স্থানীয়রা ওই বাসায় হানা দিয়ে রেবাকে উলঙ্গ অবস্থায় ওই যুবকের সাথে একই কক্ষে আটক করে। ওই ভিডিও ফুটেজে স্থানীয়রা তাকে জেরা করলে সে তার নাম রেবা খাতুন বলে জানায়। ওই ভিডিও স্যোসাল মিডিয়া ফেসবুকে আপলোড হলে ভিডিওটি ভাইরাল হয়।
এখন পর্যন্ত ওই ভিডিওটি প্রায় ১৩ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৩০ লক্ষ ভিও হয়েছে। রেবা খাতুন নিজে দেহ ব্যবসার পাশাপাশি তার আপন মেয়ে ফারহানা আক্তার ওরফে পায়েলকে দিয়েও বিভিন্ন সময় হ্যানিট্রাপের ফাঁদ পেতে অসংখ্য ব্যক্তির কাছে থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। টাকা আদায় করতে রেবা খাতুন তার মেয়েকে একাধিক ব্যক্তিকে আটকে জোরপূর্বক মোটা অংকের টাকা কাবিন করে বিয়ে দিয়েছে বলেও অসংখ্য অভিযোগ আছে। এই প্রতিবেদকের কাছে আসা বেশ কয়েকটি অভিযোগ যাচাই-বাচাই করে এসব ঘটনার সত্যতাও মিলেছে।
এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিরব থাকায় এক ভুক্তভোগী পুলিশ হেডকোয়ার্টারে অভিযোগও দিয়েছে। অভিযোগ আমলে নিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করার জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার বরাবর নির্দেশনা প্রদান করেন। যার পুলিশ হেডকোয়াটার্স ঢাকার স্বারক নং ৪৪.০১.০০০০.২০২.০৬.০৩০.২০২২-১৩৭৬ তাং ২৭/০৯/২০২৩ খ্রিঃ এবং কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার স্বারক নং ১৪৫/পি তাং ১১/১০/২০২৩ খ্রিঃ। এই হ্যানিট্রাপের ফাঁদ পেতে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় রেবা খাতুন, তার মেয়ে ফারহানা আক্তার ওরফে পায়েল ছাড়াও স্থানীয় একটি চক্র জড়িত বলেও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন।
এক ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, রেবা খাতুন ও তার মেয়ে ফারহানা আক্তার ওরফে পায়েল সমাজে প্রতিষ্ঠিত অর্থ সম্পদের মালিক এমন ব্যক্তিদের টার্গেট করে। টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে এই চক্রের ভাড়া করা বাসা পর্যন্ত নিয়ে আসার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে। টার্গেটকৃত ব্যক্তি তাদের প্রত্যাশিত বাসা পর্যন্ত আসার ৬ থেকে ৭ জনের একটি দল ওই বাসায় হানা দেই। এসময় চক্রটির সদস্যরা নিজেদের পুলিশ ও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে ওই বাসায় আটকে ফেলে। আটকের পর শুরু হয় দেনদরবার। মানসম্মান ও সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করে টার্গেটকৃত ব্যক্তির কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করে।
দাবিকৃত টাকা সাথে সাথে পেয়ে গেলে ওই ব্যক্তিকে সাময়িক সময়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। আর দাবিকৃত টাকা না পেলে মারধোরসহ তাদের চক্রের সাথে জড়িত কাজীকে দিয়ে ও আটককৃত ব্যক্তির সাথে জোরপূর্বক মোটা অংকের টাকা দেনমোহরনায় বিয়ে করতে বাধ্য করে। এই প্রতিবেদকের হাতে আসা কয়েকটি কাবিননামা যাচাই করে দেখা গেছে এসব ঘটনায় একজন কাজীকে দিয়ে এসব বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয়েছে।
ওই কাজীর নাম মোঃ নুরুল আমিন খান, ১ নং চিথলিয়া ইউপি, মিরপুর, কুষ্টিয়া। ভুক্তভোগী অন্য এক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে এই চক্রের সাথে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জড়িত আছে। ভুক্তভোগীদের কাছে থেকে আদায় করা টাকা কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়। রেবা খাতুন ও তার মেয়ে ফারহানা আক্তার ওরফে পায়েল এই চক্রের হ্যানি ট্র্যাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে কোন ভুক্তভোগী রেবা খাতুন, তার মেয়ে ফারহানা আক্তার ওরফে পায়েল বা এই চক্রের কারো বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ করলে বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করলে চক্রের অন্য সদস্যরা বিভিন্নভাবে হুমকী-ধামকীসহ থানা পুলিশ বা বিভিন্ন মহলকে তদবির করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। ওই ভুক্তভোগী দাবি করেন, হানি ট্র্যাপে ফেলে টাকা আদায় করতে রেবা খাতুন ও তার মেয়ে ফারহানা আক্তার পায়েলকে দিয়ে দেনমোহরনার টাকা আদায় করতে আদালতে মামলাও করেছেন।
তথ্যনুসন্ধানে জানা গেছে, অপর এক ভুক্তভোগী স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বার বার অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার না পাওয়ায় কুষ্টিয়ার আদালতে রেবা খাতুন ও তার মেয়ে ফারহানা আক্তার ওরফে পায়েলকে আসামী করে মামলা করেছেন। বর্তমাএন ওই মামলাটি সিআইডিতে তদন্তনাধীন।
ভুক্তভোগী ব্যক্তিসহ স্থানীয় সচেতন মহলের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কুষ্টিয়া শহরসহ আশেপাশে বেশ কয়েকটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আবাসিক বাসায় আটকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি, নামধারী কিছু সাংবাদিক, নামধারী রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা জড়িত আছে। আইনগতভাবে কোন শাস্তি না হওয়ায় চক্রটি দিনের পর দিন আরও বেপোরোয়া হয়ে উঠছে। অসংখ্য মানুষ না বুঝে তাদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। এই চক্রের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ আমলে নিয়ে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিসহ সচেতন মহল।
