বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক আফরোজা আক্তার ডিউয়ের বিরুদ্ধে স্নাতক ও মাস্টার্স এর জাল সনদ দিয়ে কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজে সহকারী প্রধানশিক্ষক পদে চাকুরীরত আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জাল সনদে চাকুরীর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে গোপন থাকলেও কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের দুই শিক্ষকের দেওয়া তথ্য বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
আফরোজা আক্তার ডিউ কুষ্টিয়া শহরের পূর্ব মজমপুর এলাকার মৃত সোহরাব হোসেনের মেয়ে ও কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম বিপ্লবের স্ত্রী। অনুসন্ধান বলছে, আফরোজা আক্তার কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ওই একই কলেজে ইংরেজী বিভাগে অনার্স ভর্তি হন। অনার্স এ তৃতীয় বিভাগ নিয়ে পাস করেন। ২০১২ সালের ১৮ই অক্টোবর তৎকালীন সময়ের কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গনে কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত করেন।
তৎকালীন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফ প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। তৎকালীন সচিব এনআই খান একাডেমিক ভবন উদ্বোধন করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালেক্টরেট স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, আফরোজা আক্তার ডিউ বিনা কারণে সহকর্মীদের সাথে গালমন্দ করে। শিক্ষকরা তার কোন কথার জবাব দিলেই তিনি তাদের জামাত শিবিরের আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করতো।
এছাড়াও আফরোজা আক্তার ডিউ এর বিরুদ্ধে নিয়মিত সকুলে না আসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্লাস না নেওয়া, স্কুলের মার্কেট নিজের এবং স্বামীর নামে করে নেওয়া, স্কুল উপস্থিত না হয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, স্কুলে আগত অভিভাবকদের সাথে খারাপ আচরণ করা, ইসলামী পোশাকে কোন ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে আসলে তাদের জঙ্গি ট্যাগ দেওয়া এবং ক্লাস না নিয়েও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে থানা পর্যায়ে সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হওয়া সহ তার মেয়েদের রেজাল্ট জালিয়াতি করার মত গুরুতর অভিযোগের কথা জানান ঐ শিক্ষক।
তিনি আরোও জানান, আফরোজা আক্তার ডিউ এর বড় মেয়ে এসএসসি পর্যন্ত স্কুলে প্রথম হলেও বোর্ড পরীক্ষায় তার রেজাল্ট স্কুলের প্রথম থেকে ১০ জনের মধ্যেও ছিলো না। অনুসন্ধান বলছে, কুষ্টিয়ার তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সাথে রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব ও ডিউ দম্পত্তির দহরম মহরম সম্পর্ক তৈরী হয়। ডিসি বাংলাতো রাত-দিনের যে কোন সময় প্রবেশের সুযোগ ছিলো আফরোজা আক্তার ডিউ।
এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নেন আফরোজা আক্তার ডিউ। নিয়োগকালে তার একাডেমিক কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করা হয়নি বলেও নিশ্চিত করেন ওই অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ। যেহেতু অনার্স এ তার তৃতীয় বিভাগ ছিলো একারনে বেসরকারী দারুল এহসান নামে (বর্তমানে ইউজিসি কতৃক কালো তালিকাভুক্ত ও হাইকোর্ট থেকে অবৈধ ঘোষিত) একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স ও মাষ্টার্স ডিগ্রী সংগ্রহ করেন ডিউ। ওই সার্টিফিকেট দিয়ে সহকারী প্রধানশিক্ষক হিসেবে অদ্যবদী চাকুরীরত আছেন।
দারুল এহসান থেকে সংগ্রহ করা তার অনার্স সার্টিফিকেটের সিরিয়াল নম্বার – ০৪৬৩৭ এবং মাষ্টার্সের সার্টিফিকেট নম্বর-০০৩৯৮১। উক্ত সিরিয়াল নম্বর দিয়ে ইউজিসি কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সার্টিফিকেট দুটি ভূয়া বা জাল। কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মৃনালকান্তি সাহার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার একাডেমিক কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করার দায়িত্ব ছিলো নিয়োগ কমিটির।
তিনি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের জানতে পেরেছি। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি জেলা প্রশাসক নিজে তদারকি করেন সেকারনে স্কুলের প্রধানশিক্ষক হিসেবে আমরা জেলা প্রশাসককে জানিয়েছে। এবিষয়ে সিধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। জেলা প্রশাসক এবিষয়ে সিধান্ত জানাতে পাারেন। অভিযোগের বিষয় নিয়ে কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক আফরোজা আক্তার ডিউয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
ভূয়া বা জাল সার্টিফিকেট দিয়ে স্বনামধন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আফরোজা আক্তার ডিউ কিভাবে চাকুরী করছেন এবিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. এহতেশাম রেজা জানান, নিয়োগের সময় কেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়নি সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কারন নিয়োগের জন্য একটি কমিটি থাকে। সেই কমিটিই নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভাল করেন। এবিষয়ে কেউ কখনও লিখিত অভিযোগ করেননি, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
