কুষ্টিয়ায় রহস্যময় সিএনজি স্টিকার:‘অঘোষিত পাস’ নাকি সংগঠিত বাণিজ্য? - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় রহস্যময় সিএনজি স্টিকার:‘অঘোষিত পাস’ নাকি সংগঠিত বাণিজ্য?

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ১৩, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন সড়কে চলাচলরত সিএনজিচালিত অটোরিকশার গায়ে সম্প্রতি এক ধরনের রহস্যময় স্টিকার দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন। স্টিকারগুলোতে দোয়েল পাখি, হরিণ, ইলিশ মাছসহ বিভিন্ন প্রতীক এবং বছরের নির্দিষ্ট মাসের নাম যেমন “জানুয়ারি-২০২৬”, “এপ্রিল-২০২৬” উল্লেখ করা থাকে। প্রথম দেখায় সাধারণ মনে হলেও মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয় চালকদের দাবি, এই স্টিকার সড়কে নির্বিঘ্ন চলাচলের এক ধরনের ‘অঘোষিত পাস’ হিসেবে কাজ করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব স্টিকার খোলা বাজারে পাওয়া যায় না। বরং একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভেড়ামারা সিএনজি স্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী মহল এই কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। স্থানীয় একাধিক সিএনজি চালক ও মালিক জানান, কুষ্টিয়া সিএনজি মালিক সমিতির মাধ্যমে হাইওয়ে পুলিশের নাম ব্যবহার করে এই স্টিকার বিতরণ করা হচ্ছে। স্টিকার পেতে হলে প্রথমে ভেড়ামারা সিএনজি স্ট্যান্ডে অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। সদস্যপদ পেতে আগে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হলেও বর্তমানে সেই পরিমাণ বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হার নেই; ব্যক্তিভেদে ভিন্ন অঙ্ক দাবি করা হয়। স্ট্যান্ডে অন্তর্ভুক্তির পর মালিকদের একটি মানি রিসিপ্ট ও স্টিকার দেওয়া হয়। চালকদের ভাষ্য, এই স্টিকার থাকলে জেলার ভেতরে গাড়ি চালাতে তুলনামূলক সুবিধা পাওয়া যায়। তবে এর বিনিময়ে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, স্টিকার প্রদান, নবায়ন এবং স্ট্যান্ড ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপে অর্থ আদায়কে ঘিরে একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে। “নূর মাস্টার” নামে এক ব্যক্তির নামও উঠে এসেছে, যিনি স্টিকার সংক্রান্ত কার্যক্রম ও কথিতভাবে হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।

তাঁর মাধ্যমে প্রশাসনের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভেড়ামারা উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ২৫০টির বেশি সিএনজি চলাচল করে বলে জানা গেছে, যার একটি বড় অংশের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে অধিকাংশ চালকই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালক জানান, স্টিকার থাকলে সড়কে ‘ঝামেলা কম’ হয়। একজন চালকের ভাষায়, “স্টিকার থাকলে দূর থেকেই দেখে অনেক সময় আর থামায় না, না থাকলে বারবার চেকিংয়ে পড়তে হয়।” অন্য একজন বলেন, “এটা একটা সিগন্যালের মতো—গাড়ি ‘ম্যানেজ’ করা আছে।”

ভেড়ামারা সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি পিকে বাপ্পি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না। বিষয়টি জানতে চালকদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। স্ট্যান্ডে ভর্তির ফি সংক্রান্ত বিস্তারিত জানতে সমিতির কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন এবং উল্লেখ করেন, সড়কে চলাচল সংক্রান্ত কিছু বিষয় ‘ম্যানেজ’ করার জন্যই এই অর্থ নেওয়া হয়ে থাকে। জেলা শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, স্টিকার বা স্ট্যান্ডভুক্তির নামে অর্থ আদায় আইনগতভাবে বৈধ নয়।

তবে কোনো সমিতি তাদের নিয়ম অনুযায়ী মাসিক চাঁদা নিতে পারে, কিন্তু কাউকে জোরপূর্বক সদস্য করা যাবে না। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চৌড়হাস হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ বলেন, বিষয়টি তাদের জানা নেই। তবে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে চৌড়হাস হাইওয়ে থানা পুলিশের সঙ্গে কথিত অর্থ লেনদেনের বিষয়টি প্রমাণসহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। সেই পর্বে হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যও যুক্ত করা হবে।