কুষ্টিয়ায় বেড়েছে ক্ষতিকর বিষবৃক্ষ তামাক চাষ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় বেড়েছে ক্ষতিকর বিষবৃক্ষ তামাক চাষ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জানুয়ারি ১, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় ক্ষতিকর বিষবৃক্ষ তামাক চাষ বেড়েই চলেছে। বছরের পর বছর ধরে তামাক চাষে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। এই কাজের সঙ্গে জড়িতরা অনেক ধরনের রোগেও আক্রান্ত হন। জমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদনও কমছে। এরপরও কোম্পানিগুলোর বীজ, সার, কীটনাশক ও অর্থের প্রলোভনে পড়ে ক্ষতিকর এই বিষবৃক্ষ চাষে ঝুঁকেছেন চাষিরা। ধান, গম, ভুট্টা চাষাবাদ কমিয়ে তারা তামাকে ঝুঁকছেন। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও অধিক মুনাফার আশায় চাষিরা যেমন তামাক চাষে ঝুঁকছেন; তেমনি এই কাজে নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নজরদারির অভাবও দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল। দেশের যেসব জেলায় তামাক চাষ বেশি হয় তার মধ্যে কুষ্টিয়া অন্যতম। এ জেলার ভেড়ামারা, দৌলতপুর ও মিরপুর উপজেলার কৃষকরা তামাক চাষের প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকেছেন। বিভিন্ন এলাকায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে তামাক চাষ হচ্ছে। তামাক পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন শিশু বৃদ্ধসহ তামাক চাষির পরিবারের সবাই।

তবে কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সুফি মো. রফিকুজ্জামান বলেন, তামাক চাষের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এ জেলায় প্রায় ১১ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। এসব তামাক পোড়ানোর জন্য হাজারো ঘর বানানো হয়েছে। এসব ঘরের চুল্লিতে ব্যবহার করা হচ্ছে হাজার হাজার টন জ্বালানি কাঠ। তামাক পোড়ানোর ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। জানা গেছে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি, ঢাকা ট্যোবাকো, জাপান ট্যোবাকো, আবুল খায়ের ট্যোবাকো, নাসির ট্যোবাকো, আকিজ ট্যোবাকোসহ বেশ কয়েকটি তামাক কোম্পানি বীজ, সার, কীটনাশক ও অগ্রিম ঋণসহ নানা সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে তামাক চাষ করতে চাষিদের আগ্রহী করে তুলেছে।

এ কোম্পানিগুলোর আর্থিক সহযোগিতা, বিনামূল্যে বীজ, ঋণে সার ও নগদ অর্থসহ তামাক ক্রয়ের নিশ্চয়তার কারণে তামাক চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তামাক চাষ বন্ধ করে বিকল্প ফসলের আবাদ করার ও তামাক চাষের ক্ষতি তুলে ধরে সরকারিভাবে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহলের মানুষ। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হলেও তামাক কোম্পানির লোভনীয় আশ্বাসের কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। কৃষকদের তামাক চাষের কুফলগুলো বোঝাচ্ছেন এবং তামাকের বদলে অন্যান্য ফসল চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, কুষ্টিয়ার ৬ উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ১১ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে।

গত বছরে ১০ হাজার ৯৩১ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছিল। প্রতিবারই দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি তামাক চাষ করা হয়। ২০১৯-২০ সালে দৌলতপুর, ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলায় তামাক চাষ হয়েছিল ১০ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে। এবার চাষ হয়েছে ১১ হাজার ৩৬৬ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে দৌলতপুর উপজেলায় ৩ হাজার ৬৮৫ হেক্টর, ভেড়ামারায় ৮৩০ হেক্টর এবং মিরপুর উপজেলায় ৬ হাজার ৮৫১ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে। যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। মিরপুর উপজেলায় কৃষি জমি ২৩ হাজার ১১১ হেক্টর, ভেড়ামারায় ১০ হাজার ৮৯১ হেক্টর এবং দৌলতপুর উপজেলায় কৃষি জমি রয়েছে ৩২ হাজার ৪৪৮ হেক্টর। ভেড়ামারা তামাক চাষি মাসুদ, সেরেগুল বলছেন, তামাক চাষে প্রচুর খাটুনি। স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হয়। তারপরও রাতদিন পুরুষ, নারী ও শিশুরা কাজ করে।

তামাকের সময় বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তামাক চাষে লাভ বেশি। প্রতি বিঘায় প্রায় ১ লাখ টাকার তামাক বিক্রি হয়। প্রতি বিঘায় ৫ হাজার চারা লাগানো যায়। বিঘায় ১০ মণ শুকনো তামাক হয়। প্রতি কেজি শুকনো তামাক বিক্রি হয় প্রায় ২০০ টাকায়। খরচ হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। লাভ থাকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। তামাকের আবাদ তিন মাসেই হয়ে যায়। বোরো ধান চাষে খরচ অনেক বেশি। তাই অনেকে তামাক চাষে ঝুঁকছেন। তামাক কোম্পানির সুপারভাইজার ও কর্মকর্তারা চাষিদের উৎসাহ এবং অনেক সুযোগ-সুবিধা দেন। তারা প্রতিদিন মাঠে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। দৌলতপুর উপজেলার হারুনুর রশীদ আসকার জানান, তামাক চাষে অতিরিক্ত সার ব্যবহার করার ফলে ভালো ফলন হয়। সার তাদের কিনতে হয় না। বিভিন্ন কোম্পানি চাষীদের সহায়তা করে। তামাক বিক্রির ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না।

কোম্পানিগুলো তামাক কিনে নেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, তামাক উৎপাদনের আগে কোম্পানিগুলোর দর নির্ধারণ, বিক্রির নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও পরামর্শের কারণে তামাক চাষ বাড়ছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইনের ১২ ধারায় তামাকজাতীয় ফসল উৎপাদন ও চাষ নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিমালা গ্রহণ করতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। জেলার দৌলতপুর, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে তামাক ক্ষেত। তামাকের ক্ষেতে কেউ পরিচর্যা করছেন, কেউ নষ্ট পাতা কাটছেন, তামাক পাতা তুলছেন। আবার কেউ তামাকের পাতা মাঠ থেকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ তামাক শক্ত লাঠির সঙ্গে বাধছেন। তামাক পোড়ানো ও প্রক্রিয়াজাতের কাজ করছেন নারী, বৃদ্ধা ও শিশুরা। দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, তামাক স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তামাকের গুঁড়া বাতাসের সঙ্গে মানুষের শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। তামাক ফুসফুসের ক্ষতি করে। তামাকের কারণে মানুষের ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা, টিবিসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে। তামাকের গুঁড়া বাতাসের সঙ্গে মানুষের শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। সবচেয়ে বেশি ফুসফুসের রোগ হয়। তামাকের কাজ করার কারণে অনেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তিনি এ ব্যাপারে কৃষকদের সচেতন করে তোলার আহ্বান জানান।