কুষ্টিয়ায় প্রস্তুত ২ লাখেরও বেশি গবাদিপশু - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় প্রস্তুত ২ লাখেরও বেশি গবাদিপশু 

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ৯, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আসন্ন কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সারা দেশের মতো কুষ্টিয়া জেলাজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। পবিত্র এই উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় খামারি ও প্রান্তিক কৃষকদের ব্যস্ততা এখন চরমে। জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কোরবানির পশুর বিশাল চাহিদা মেটাতে এবার কুষ্টিয়ায় দুই লক্ষাধিক গবাদিপশুকে সম্পূর্ণ দেশীয় ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা হয়েছে, যা শুধু স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও একটি বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জেলার ছয়টি উপজেলায় ছোট, মাঝারি ও বড় পরিসরে গড়ে ওঠা প্রায় ১৯ হাজার গরুর খামার রয়েছে। এর বাইরেও প্রতিটি গ্রামের সাধারণ কৃষক পরিবারগুলো তাদের বসতবাড়িতে নিজস্ব উদ্যোগে পশু পালন করছেন। কোরবানির হাটে দেশাল বা দেশীয় জাতের গরুর প্রতি ক্রেতাদের যে চিরায়ত আকর্ষণ রয়েছে, সেটি মাথায় রেখেই এবার প্রায় দুই লাখ পশু মোটাতাজা করা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তুতকৃত এই বিপুল সংখ্যক পশুর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। অন্যদিকে, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে আরও প্রায় এক লাখের মতো। কুষ্টিয়ার এই পশুগুলো শুধু স্থানীয় হাটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের অন্যান্য বড় বড় শহরের পশুর হাটগুলোতে এগুলো সরবরাহের জন্য নানামুখী প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু হয়ে গেছে।

দেশের বড় শহরের ক্রেতাদের কাছে কুষ্টিয়ার গরুর শারীরিক গঠন, সুস্থতা এবং মাংসের গুণগত মানের কারণে বরাবরই একটি আলাদা ও বিশেষ কদর থাকে। তাই শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় খামারিরা এখন দিনরাত এক করে ফেলছেন, যাতে পশুগুলো হাটে তোলার সময় সর্বোচ্চ আকর্ষণীয় ও সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে। তবে এত প্রস্তুতির মাঝেও খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট।

সদর উপজেলার হরিপুর এলাকার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ খামারি মোক্তার হোসেন তার উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, কুষ্টিয়ার গরুর কদর রাজধানী ঢাকাসহ সব বড় বাজারেই রয়েছে, তবে এবার গো-খাদ্যের বাজারদর আকাশছোঁয়া। খৈল, ভুসি, খড় ও সবুজ ঘাসসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের দাম গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় পশু পালনের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যে পরিমাণ অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে আমরা একটি গরুকে হাটে তোলার উপযোগী করেছি, যদি বাজারে তার সঠিক ও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাই, তবে লাভের বদলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।

এতে করে অনেক প্রান্তিক খামারি তাদের আসল পুঁজিটুকুও হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। একই এলাকার আরেক খামারি দেলোয়ার হোসেন পশুর প্রাকৃতিক পরিচর্যার দিকটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ার খামারিরা সাধারণত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে, উন্মুক্ত আলো-বাতাসে এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাইয়ে গরু বড় করে থাকেন, যা স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দের। তবে তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে লাভের আশায় এই পশুগুলো লালন-পালন করি। কিন্তু ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে যদি বিদেশি গরু দেশের বাজারে প্রবেশ করে, তবে দেশীয়

খামারিরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। তিনি সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোরবানির এই ভরা মৌসুমে বৈধ বা অবৈধ কোনো পথেই যেন সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশি গরু দেশে ঢুকতে না পারে, সেজন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরও কঠোর ও জোরদার করতে হবে।

খামারিদের এই শঙ্কা এবং পশু মোটাতাজাকরণের বিষয়ে কথা হয় কুষ্টিয়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আল মামুন হাসান মন্ডলের সাথে। তিনি অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে জানান, জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সারা বছরই খামারিদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কোনো খামারি বা কৃষক যেন দ্রুত লাভের আশায় পশুকে ক্ষতিকর স্টেরয়েড, রাসায়নিক বা ভেজাল কোনো খাদ্য প্রদান না করেন, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত উঠান বৈঠক, কাউন্সেলিং ও তদারকি চালিয়ে যাচ্ছেন।

সম্পূর্ণ দেশীয় ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যবান পশু তৈরির জন্য প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তিনি দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করেন যে, এবার কোরবানির হাটে খামারিরা তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে লালন-পালন করা পশুর অত্যন্ত লাভজনক ও ন্যায্য মূল্য পেয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরবেন।