নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়ায় নির্বাচন পরবর্তী ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। জেলার চারটি সংদীয় আসনেই পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের বাড়ি-ঘরে হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ১৩ জন কর্মী-সমর্থকের ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাত্ব করা হয়েছে। এদের মধ্যে আহত ১১ জনকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয়েছে কুষ্টিয়া সদর ও কুমারখালী উপজেলায়।

সদরে পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থককের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছে নৌকার সমর্থক পৌর কাউন্সিলরের ক্যাডাররা। এতে তাঁর হাতের দশটি আঙ্গুলসহ সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে সব উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায়। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গত রবিবার রাতে ও সোমবার সকালে এসব হামলার ঘটনা ঘটে।
কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনের পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করছেন নৌকার সমর্থকরা। এছাড়া ঘটেছে বাড়ি ঘরে হামলা ও ভাংচুর। এ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে হেরে যান মেয়রপুত্র ঈগল প্রতীকের পারভেজ আনোয়ার তণু। তবে ভোটে ব্যাপক কারচুপি করে তিনি জয়লাভ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গতকাল রাতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পরই পৌর ১৬ নং ওয়ার্ডের কুমারগাড়া এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ঈগল প্রতীকের সমর্থক রজব আলীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁর সারাশরীর ক্ষতবিক্ষত করেছে নৌকার সমর্থক স্থানীয় কাউন্সিলর এজাজ আহমেদের ক্যাডাররা। রবিবার রাত ৮টার দিকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ক্যাডার ধারালো অস্ত্র নিয়ে রজব আলীর ওপর হামলা করে। এসময় সন্ত্রাসীরা তাঁর সারাশরীর কোপাতে থাকে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রজব আলীর হতের দশটি আঙ্গুল, বুক, পিঠ, দুই পা’সহ সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। তাঁকে বাঁচাতে ভাতিজা বেলাল হোসেন এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীরা তার মাথায়ও কোপ দেয়। এতে বেলালের মাথায় ছয়টি সেলাই দেয়া লেগেছে।
এদিকে সোমবার সকালে সদর উপজেলার গোস্বামী দূর্গাপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান দবির উদ্দিনের নেতৃত্বে একাধিক বাড়িতে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এসময় বেশ কয়েকজনকে পিটিয়ে আহত করা হয়। প্রায় ২০/২৫ জন ক্যাডার স্থানীয় খালেক, খেদ আলী, বানাত মালিথা ও সেন্টুর বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে। কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনেও পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকের বসতভিটা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। গত রবিবার রাতে মিরপুর উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের কুন্টিয়ারচর গ্রামে মকবুল হোসেনের বসতভিটায় আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বত্তরা। কয়েক মিনিটের মধ্যে তার বাড়ির সবকিছু আগুনে পুড়ে ছায় হয়ে যায়। স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ সুমন চ্যাটার্জি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ১০জন আহত হয়েছেন। এসময় বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন, নির্বাচনী অফিস ও দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়েছে। পরাজিত ঈগল প্রতীকের প্রার্থীর এক সমর্থকের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও আগুন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে বিজয়ী ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী রেজাউল হক চৌধুরীর সমর্থকরা তাঁদের বাড়ি ঘরে আগুন দেয়। সোমবার সকাল ১০টার দিকে দৌলতপুর উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দৌলতপুর থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, জগন্নাথপুর গ্রামের আবু হানিফ এবারের সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি প্রয়াত আফাজ উদ্দন আহমেদের ছেলে নাজমুল হুদা পটলের সমর্থক। তিনি একজন ভিডিপি সদস্য। তিনি পটলের ঈগল প্রতীকের পক্ষে এলাকায় প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেন। নির্বাচনে পটল পরাজিত হযেছেন। এ আসনে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল হক চৌধুরী। সোমবার সকালে রেজাউলের সমর্থক একই এলাকার সালামত ফকির, একা ফকির, মুন্না ফকিরসহ বেশ কয়েকজন আবু হানিফের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা বেশ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটান। খবর পেয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক এহেতেসাম রেজা ও পুলিশ সুপার আব্দুর রাকিবসহ প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থলে যান।
এ ব্যাপারে আবু হানিফের ভাই আব্দুর রহিম বাদি হয়ে দৌলতপুর থানায় একটি মামলা করেছে। অপরদিকে সোমবার সকালে উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর মধ্যপাড়ায় পরাজিত নৌকার প্রার্থী সরোয়ার জাহান বাদশার সমর্থক আব্দুল রহিম ফকিরের বসতবাড়িতে আগুন দেয় ও তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রেজাউল হক চৌধুরীর কর্মী-সমর্থকরা। এতে অন্তত ৩জন রক্তাক্ত জখম হয়েছেন। গুরুতর আহতাবস্থায় তাদেরকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তুফান ফকিরের অবস্থা অবনতি হলে তাঁকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়েছে। একই সময় উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের বিশ্ববাতবাজার এলাকায় নৌকা প্রার্থীর নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর চলানো হয়েছে। একই সময় উপজেলার সোনাইকুন্ডি এলাকায় নৌকার কর্মী শ্রমিকলীগ নেতা মাহি বিশ্বাসের সোনাইকুন্ডি বসতবাড়িতে ইট পাটকেল ছোঁড়া ও নিরাপত্তা প্রাচীর ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে ট্রাক মার্কার কর্মীদের বিরুদ্ধে। এদিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের শাদীপুরে বাজার এলাকাতেও অন্তত দশটি দোকানঘরে ভাঙচুর করে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রেজাউল হক চৌধুরীর কর্মী-সমর্থকরা। এর প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে ব্যবসায়ীরা। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। কুষ্টিয়া-১ আসনের নব নির্বাচিত সাংসদ বলছেন, এটি একাটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তিনি বলেন, কে ভোট দিয়েছে আর কে তাকে ভোট দেন- এ প্রশ্ন এখন অবান্তর। তিনি সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানান।
কুষ্টিয়া-৪ কুমারখালী-খোকসা আসনে নির্বাচনে ফলাফল ঘোষণার পর স্বতন্ত্র ট্রাক ও নৌকার সমর্থকদের বাড়িঘরে পাল্টাপাল্টি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড দক্ষিণ মনোহরপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ভোট গ্রহণ শেষে বাড়ি ফেরার পথে নৌকার সমর্থকরা ট্রাক মার্কার পোলিং এজেন্ট অহিদুল ও সমর্থক তেফাজ্জেল বিশ্বাস, মানিক বিশ্বাসসহ সমর্থকদের উপর দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়।
এসময় গুরুতর আহত অবস্থায় পোলিং এজেন্টসহ ৫জনকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত হয়েছেন তোফাজ্জেল বিশ্বাস, মানিক বিশ্বাস, শুভ ও আব্দুল মজিদ। এদের মধ্যে তোফাজ্জেলের ১৫ সেলাই ও মানিকের ৬ সেলাই দেয়া লেগেছে। কুমারখালী থানার ওসি আকিবুল ইসলাম জানান, পোলিং এজেন্টসহ ৪ জনকে পিটিয়ে আহতের ঘটনায় কুমারখালী থানায় মামলা হয়েছে। অপরদিকে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনার পর জয়ী প্রার্থী আব্দুর রউফের সমর্থকরা নৌকার সমর্থক রাজ্জাক হোসেন (চুকা), উম্মত আলী, জয়নাল, আজিজ ও হাফিজের বাড়িতে ও দোকানে হামলা করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে।
