বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ভোর ছয়টা। ফজরের নামাজ শেষে মানুষজন যখন ঘরে ফিরতে শুরু করেছে, তখন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কুমারগাড়ায় অবস্থিত বিসিআইসির সার ডিলার আমজাদ ট্রেডার্স থেকে ট্রলিতে করে সার লোড করার দৃশ্য চোখে পড়ে। স্বাভাবিক সময়ের বাইরে এমন কর্মকাণ্ড দেখে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এই সার কোথায় যাচ্ছে? কৌতূহল থেকে ট্রলির পিছু নেন এই প্রতিবেদক। ট্রলি চালক ও ডিলার মালিক রাজু জানান, সার বোঝাই ট্রলিটি যাচ্ছে বরিয়া গ্রামে। যেহেতু আমজাদ ট্রেডার্স বটতৈল ইউনিয়নের ডিলার, তাই সেখানে সার পাঠানো স্বাভাবিক বলেই দাবি করেন তারা।
কিন্তু ট্রলিটি বরিয়া গ্রাম অতিক্রম করার পর সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। শেষ পর্যন্ত ট্রলির গন্তব্য হয় আলামপুর ইউনিয়নের ভাদালিয়া বাজারে অবস্থিত শাজাহান সারের দোকান। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী ওই দোকানে কোনোভাবেই আমজাদ ট্রেডার্সের সার সরবরাহ করার কথা নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দোকান মালিক শাজাহান বলেন,“আমি ছোট ব্যবসায়ী। মাত্র ২৫ বস্তা ইউরিয়া সার এনেছি। এটা নিয়ে কী করবেন? চাইলে তো ট্রাকে ট্রাকেও সার আনা যায়।” তার বক্তব্যেই স্পষ্ট হয় যে, ডিলার পর্যায় থেকে সরাসরি খুচরা দোকানে সার বিক্রির একটি অনিয়মিত চক্র বিদ্যমান থাকতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা। পরে আমজাদ ট্রেডার্সের কর্ণধার রাজুর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আইনের মধ্যে পড়ে না, সেটা ঠিক। কিন্তু সার নিয়ে আমরাও বিপাকে আছি। বর্তমানে বিক্রি খুবই কম।
অন্যদিকে ভুট্টার চাষ হওয়ায় কিছু জায়গায় চাহিদা আছে। তাই বিক্রি করেছি।” তিনি আরও জানান, প্রায় ২৫-৩০ বছর ধরে তারা সরকারি সার ডিলার হিসেবে কাজ করছেন। আগে তার বাবা দায়িত্বে থাকলেও বর্তমানে তিনিই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বছরের এই সময়টায় প্রায় প্রতি বছরই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমানে তারা ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সার ১৩৩০ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানান রাজু। যদিও সরকারিভাবে কৃষক পর্যায়ে এই সারের নির্ধারিত বিক্রয়মূল্য ১৩৫০ টাকা বলে তিনি দাবি করেন। তবে সরকার থেকে কত দামে তারা সার সংগ্রহ করেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। স্থানীয় একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, এই ধরনের লেনদেন নতুন কিছু নয়। প্রায়ই বড় বড় চালান ডিলারদের কাছ থেকে খুচরা দোকানদাররা কিনে নিয়ে যান। তবে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা জরুরি বলে মনে করছেন তারা। একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“আজকে যে পরিমাণ সার দেখেছেন সেটা খুবই সামান্য। এর চেয়ে বড় বড় চালান নিয়মিতই চলে।”
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) এর নীতিমালা অনুযায়ী, অতিরিক্ত মজুদ বা অনিয়মিত সরবরাহ বেআইনি। এটা খুচরা ব্যবসায়ীর হাতে না গিয়ে সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানোর কথা। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রূপালী খাতুন বলেন, “বর্তমানে সারের চাহিদা কম—এটা ঠিক। তাই বলে ডিলার এভাবে অন্যত্র বিক্রি করতে পারেন না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কৃষকের কাছে পৌঁছানোর কথা যে সার, সেটি যদি ভোরের অন্ধকারে ট্রলিতে করে অন্য ইউনিয়নের খুচরা দোকানে পৌঁছে যায়—তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই চক্র কতদিন ধরে চলছে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত? স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে সরকারি সার প্রকৃত কৃষকের কাছেই পৌঁছায়।
