কুষ্টিয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দই-মিষ্টি উৎপাদন-হুমকিতে জনস্বাস্থ্য - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দই-মিষ্টি উৎপাদন-হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ২৯, ২০২৬

প্রশাসনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া পৌরসভার চৌড়হাস এলাকায় অস্বাস্থ্যকর, নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে দই, মিষ্টি, ঘি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে খাদ্যপণ্য তৈরি ও বাজারজাত করে আসছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

এতে ওই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এবং জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। স্থানীয়রা জানান, চৌড়হাস মোড় ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি মিষ্টি ও দধি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। উৎপাদন কক্ষগুলো অপরিচ্ছন্ন, দুর্গন্ধযুক্ত এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। খাদ্য প্রস্তুতের স্থানে নেই পর্যাপ্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত সংরক্ষণ সুবিধা।

সরেজমিনে দেখা যায়, উৎপাদিত দই, রসগোল্লা, মিষ্টি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী অনেক জায়গায় খোলা অবস্থায় রাখা হয়েছে। কিছু স্থানে বাসি খাবারের ওপর মাছি বসে থাকতে দেখা গেছে। মেঝে নোংরা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল এবং পরিবেশজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে। এমন পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন হওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এসব কারখানার বেশিরভাগই আবাসিক এলাকার ভেতরে গড়ে উঠেছে। ফলে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা গ্যাস বিস্ফোরণের মতো ঝুঁকি বাড়ছে। ভারী যন্ত্রপাতি, চুলা ও দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হলেও নেই দৃশ্যমান অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় ক্রেতাদের দাবি, প্রতি পাত্র দইয়ে ঘোষিত ওজনের তুলনায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত কম দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, প্যাকেট বা পাত্রে নির্ধারিত ওজন উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তা কম পাওয়া যায়। এতে সাধারণ ক্রেতারা প্রতিনিয়ত আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চৌড়হাস এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান, কুমারখালী দধি ভান্ডার, মধুবন সুইটস, বনফুল সুইটস, বীরেন দধি ভান্ডার ও জুগোল দধি ভান্ডার এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের ফায়ার সেফটি লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র, কারখানা নিবন্ধন কিংবা স্বাস্থ্য সনদ নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে। খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে মিষ্টি, দই ও দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর অনুমোদন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ বাধ্যতামূলক।

পাশাপাশি বিশুদ্ধ কাঁচামাল ব্যবহার, অনুমোদিত খাদ্যগ্রেড রং ও রাসায়নিক প্রয়োগ, পরিষ্কার উৎপাদন পরিবেশ এবং সঠিক মোড়কজাতকরণ নিশ্চিত করতে হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অনুযায়ী অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একইভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ অনুযায়ী ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল বা প্রতারণামূলকভাবে পণ্য বিক্রি করলে জরিমানা, কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে অভিযুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা দাবি করেন, নিয়ম মেনেই উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যদিও সরেজমিনে গিয়ে কিছু অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। প্রসঙ্গে বিএসটিআই আঞ্চলিক কার্যালয় কুষ্টিয়ার সহকারী পরিচালক দেবব্রত বিশ্বাস বলেন, অবশ্যই বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। তারা যদি অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি করে তবে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যৌথ অভিযান পরিচালনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। দ্রুত তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, নিয়মিত তদারকি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তারা বলেন, মানুষের খাদ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ কাউকে দেওয়া উচিত নয়।