কনক হোসেন ॥ কুষ্টিয়ার পৌর বাজারে গত ২ দিনের বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে সবজির বাজার সহ নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যেই, বিভিন্ন সবজির মৌসুম শেষের দিকে, বাজারে সরবরাহ কম এমন নানা অজুহাতে বাজারে বেড়েছে সব ধরনের সবজির দাম। বাজারে বেগুন প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া অন্যান্য সব ধরনের সবজির দামই গত সপ্তাহের তুলনায় বাড়তি যাচ্ছে বাজারে। কুরবানীর ঈদের পূর্বে যদিও সবজি বাজারে দামের স্থিতিশীলতা পরিলক্ষিত হয়েছিল কিন্তু এখন সবজির বাজার সহ নিত্য পণ্যের সকল ধরনের পণ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজমান। বাজার করাটা নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অতি কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বেশ কিছু বছর ধরে বাজার নিয়ন্ত্রণ কথাটি যেন অলীক চিন্তা ছাড়া আর কিছুই নয়। কুষ্টিয়ার পৌর বাজারে নেই কোন মনিটরিং এর ব্যবস্থা।
ক্রেতা সাধারণের অভিযোগ, কুষ্টিয়া পৌরবাজারের স্বচ্ছ মনিটরিং এর বড়ই অভাব। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের হাতেই যেন বন্দি কুষ্টিয়ার পৌর বাজার। একদিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চিকিৎসা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা সহ প্রয়োজনীয় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে যেমন দ্বিগুণের বেশি খরচ বেড়েছে, আবার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষেরা মৃতপ্রায় অবস্থা। কুষ্টিয়া পৌরবাজারে বাজার করতে আসা মাদ্রাসার একজন কর্মচারী আব্দুর রহমান ভাই অশ্রুসিক্ত নয়নে জানান, তার মাসিক ইনকাম ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা বাজারের প্রত্যেকটি দ্রব্যমূল্যের দাম তার ক্রয়সীমার বাইরে, আজকের জন্য তিনি শুধুমাত্র একটি লাউ ৪০ টাকা কিনেছেন এই লাউ দিয়ে তার দুই দিন চলতে হবে! এ ধরনের মানুষের সন্তানদেরকে আমিষের অভাব পূরণে তারা ব্যর্থ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা বিকাশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নিত্য পণ্যের বাজার যেন শুধুমাত্র উচ্চ শ্রেণীর জন্য। ভ্যান চালক শরিফ ও হোসেন প্রতিদিন গড় আয় করেন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। পথে চলতে গিয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা খরচ হয়ে যায়। কোন কোনদিন আবার ভ্যান মেরামতের জন্য খরচ হয়ে যাই দেড় থেকে ২ হাজার টাকা। তারা জানান সারা বছর শুধুমাত্র ভাঁজি ভর্তা ডাল দিয়ে খাবার খেয়ে দিন কাটিয়েও তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে প্রতি মাসে। বাচ্চাদেরকে পড়াশোনা করাতে পারে না অর্থের অভাবে।
এই ৪০০ টাকার ইনকাম দিয়ে তাদের সংসার চালানো অসম্ভব। তবুও টিকে থাকার লড়াইয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হয় তাদেরকে। বাজারে ঢুকে পেঁয়াজ রসুন আর সবজি মরিচ কিনেই টাকার সর্বোচ্চটুকু শেষ করেও পাইনা কুল, এমনটিই জানালেন অশ্রুসিক্ত নয়নে।
আর মাছ-মাংস তো তাদের কাছে কল্পনা করা ছাড়া আর কিছুই না। কোরবানির ঈদ দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। আবার নতুন করে ঈদ পরবর্তী সময়ে মাংসের দাম কিছুটা কম থাকলেও সবজির বাজারে আগুন। ঈদের আগে থেকেই সব ধরনের মুরগির মাংসের দাম নিম্নমুখী ছিল।
ঈদের পূর্বে ব্রয়লার মুরগির দাম দুইশ’ টাকা থাকলেও আজ ব্রয়লার মুরগির দাম দুইশ’র নিচে। একইসঙ্গে কমেছে সোনালী মুরগি ও লেয়ার মুরগির দামও। বিক্রেতারা বলছেন, কোরবানির ঈদে সবাই কোরবানির মাংস ফ্রিজে রেখে দিয়েছে এবং তারা এখনো সেগুলো খাচ্ছে, যার জন্য এখনও মুরগির দাম কমের দিকেই আছে। তবে কিছুদিন পর থেকে আবার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিক্রেতা। কেন বাড়তে পারে বিষয়টি বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি জানান বাজারে চাহিদা বেড়ে গেলেই খামারিরা মুরগির দাম বাড়িয়ে দিবে আর খামারিরা মুরগির দাম বাড়িয়ে দিলে বাজারেও খুচরা মূল্য বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে মুরগির দাম কমলেও বেড়ে চলেছে আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ সব ধরনের তরকারির দাম। ক্রেতা সাধারণ মনে করেন কোরবানির ঈদের কারণে মাংসের দাম বৃদ্ধি না করতে পারায়, কৃত্রিমভাবেই বাড়ানো হচ্ছে সব ধরনের সবজি ও মাছের দাম। অন্যদিকে বর্তমানের তুলনায় আরও দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিক্রেতারা।
গত ৩০ এ জুন কুষ্টিয়ার মিউনিসিপাল কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে প্রত্যেকটি সবজির দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে কিন্তু কমেনি কোন প্রকার সবজির দাম। আজকের বাজারে প্রতি কেজি- টমেটো ১৩০ টাকা, দেশি গাজর ৮০, চায়না গাজর ১৫০, লম্বা বেগুন ১০০, সাদা গোল বেগুন ৯০, কালো গোল বেগুন ৮০, শসা ৫০-৭০, উচ্ছে ৯০, করলা ১০০, পেঁপে ৫০-৬০, ঢেঁড়স ৬০, পটল ৫০-৭০, চিচিঙ্গা ৬০, ধুন্দল ৫০, ঝিঙা ৬০, বরবটি ৬০, কচুর লতি ৮০, কচু ১০০-১২০, মিষ্টি কুমড়া ৪০, শজনে ১০০- ১২০, কাঁচা মরিচ ২০০, ধনেপাতা ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর মানভেদে প্রতিটি লাউ ৩০-৪০, চাল কুমড়া ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা।
কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে আকাশচুম্বি!!! ঈদের পূর্বে কাঁচা মরিচ ছিল ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা কিন্তু ঈদ পরবর্তীতে মোটামুটি গত সপ্তাহ পর্যন্ত কিছুটাও পরিবর্তিত থাকলেও গত দুই-তিন দিনের বৃষ্টিতে কাঁচা মরিচের দাম বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত। আজকের বাজারে সব ধরনের পেঁয়াজ ৮০-৯০, লাল আলু ৫৫, সাদা আলু ৬০, বগুড়ার আলু ৭০, নতুন দেশি রসুন ২০০, চায়না রসুন ২২০, চায়না আদা ২৮০, ভারতীয় আদা ২৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানেই পেঁয়াজের দাম ১০-২০ টাকা, আলুর দাম ৫-১০, দেশি রসুনের দাম ৩০ টাকা বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে আলু-পেঁয়াজ বিক্রেতা মাফি বলেন, এখন আর দাম কমার সুযোগ নাই। বরং দাম বাড়তে পারে। আরেক বিক্রেতা ফরিদ বলেন, কোরবানির ঈদের আগে সাধারণত আদা রসুন পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়, কিন্তু এবার চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ঈদ পরবর্তীতে সবজি সহ বিভিন্ন নিত্য পণ্যের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাজার করতে আসা আবুল চাচা বলেন, পেঁয়াজের দাম মনে হচ্ছে প্রতি সপ্তাহে ২০-৩০ টাকা করে বাড়ছে। আর হুট করেই আলুর দামও বেড়ে যাচ্ছে। কোনও বিশেষ উৎসব সামনে থাকলে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এবার কোরবানির ঈদ পর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রিত থাকলেও শোকজির দাম হুহু করে বেড়ে যাচ্ছে। এটা কি মগের মুল্লুক? আজকের বাজারে রুই মাছ মান ভেদে কেজি প্রতি ৩৪০-৭০০ টাকা, কাতল মাছ ৩৬০-৬০০ টাকা। আজ ইলিশ ১৪০০-২৪০০, কালিবাউশ ৪৫০-৫০০, চিংড়ি ১০০০-১৩০০, কাঁচকি ৫০০, কৈ ২৬০-৩৫০, পাবদা ৫০০-৮০০, শিং ৪০০-৬৫০, টেংরা ৬৫০-৮০০, বেলে ৬০০-১২০০, বোয়াল ৭০০-১০০০ ও রূপচাঁদা মাছ ১২০০-১৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঈদের পরে কমেছে সব ধরনের মুরগির দামই। ব্রয়লার মুরগির দাম আজ কিছুটা কমেছে। কমেছে কক ও লেয়ার মুরগির দাম। আজ ব্রয়লার মুরগি ১৯০, কক ২৭৫-২৮০, লেয়ার ২৭০, দেশি মুরগি ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দাম অপরিবর্তিত। লেয়ার মুরগির দাম কমেছে কেজিতে ৫০ টাকা এবং কক মুরগির ৬০ সোনালী মুরগির দাম ৭০ টাকা। দীর্ঘদিন ধরে সোনালী মুরগির দাম ৩০০ টাকার উপরে থাকলেও আজকে তা কমেছে।
মুরগি বিক্রেতা বলেন, এখন সব ধরনের মুরগির দামই কমেছে। এখন এরকম দামের মধ্যেই থাকবে। তবে কিছুদিন পর থেকে কিছুটা বাড়তে পারে। বাজারে মুরগির দাম কমলেও অপরিবর্তিত রয়েছে গরুর মাংস ও ডিমের দাম। গরুর মাংস আজ ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকা কেজি দরে। মুরগির লাল ডিম ১৫০ টাকা এবং সাদা ডিম ১৪০ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দোকানি আব্দুল হোসেন বলেন, ডিমের দাম ঈদের পূর্বে থেকে এখন পর্যন্ত অপরিবর্তিত রয়েছে।
বাজারে মুদি দোকানের পণ্যের দাম রয়েছে মোটামুটি অপরিবর্তিত। এদিকে সবকিছুর দাম বাড়লেও মুদিপণ্য রয়েছে মোটামুটি অপরিবর্তিত। আজ প্যাকেট পোলাওর চাল ১৫৫, খোলা পোলাওর চাল মানভেদে ১১০-১১৫, ছোট মসুর ডাল ১৩৫, মোটা মসুর ডাল ১১০, বড় মুগ ডাল ১৫০, কলাই ডাল ১৮০, ছোট মুগ ডাল ১৬০, খেসারি ডাল ১২০, বুটের ডাল ১১৫, ডাবলি ৮০, ছোলা ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬৫, খোলা সয়াবিন ১৫০, কৌটাজাত ঘি ১৩৫০, খোলা ঘি ১২৫০, প্যাকেটজাত চিনি ১৫০, খোলা চিনি ১৪০, দুই কেজি প্যাকেট ময়দা ১৫০, আটা দুই কেজির প্যাকেট ১৩০, খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতাগণের দাবি বাজারে বিশেষ ভাবে নজরদারি না করলে ঈদের আগে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের হাতে বন্দি হয়ে যাবে কুষ্টিয়া পৌর বাজার। অসহায় মানুষ রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের লোকেরা বলেন, বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বাজারদরের উপর বিশেষ খবরদারি এবং আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ না করলে, না খেতে পেয়ে মারা যেতে হবে তাদের। সচেতন মহলের দাবি, বাজারে বিশুদ্ধ মনিটরিং এর মাধ্যমে এখনই সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদেরকে প্রতিহত করে, বাজারের দ্রব্যমূল্যের সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। নতুবা নিম্ন আয়ের মানুষেরা সংসারের চাপ গ্রহণ করতে না পেরে বিভিন্ন অপরাধ ও চুরির মধ্যে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
