মিজানুর রহমান নয়ন ॥ প্রায় দেড়শ বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সাংস্কৃতিক জনপদ কুমারখালী। এখানে রয়েছে উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাপুড়িয়া হাট। অসংখ্য মুনিষীদের বসবাস। আছে রেলস্টেশন। তবুও থামেনা সুন্দরবন ও বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। ‘ আক্ষেপ করে কথা গুলো বলছিলেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত নুরুল টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া আনছার মিলন। তিনি উপজেলা যুবদলের আহবায়ক।মিলন বলেন, স্টেশনে ওই ট্রেন দুটির যাত্রাবিরতির দাবিতে কর্তৃপক্ষকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। আজ দুপুর ১২ টা আল্টিমেটাম শেষ হবে। এরমধ্যে যাত্রাবিরতি চালু না হলে বৃহৎ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।জানা গেছে, কুমারখালীর বুকের উপর দিয়ে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৭২৫ – ৭২৬ এবং বেনাপোল এক্সপ্রেস ৭৯৫ – ৭৯৬ নামের ট্রেন দুটি ঢাকা – খুলনা চলাচল করে।
তবে কুমারখালীতে ট্রেন দুটির যাত্রাবিরতি নেই। প্রতিবাদে কুমারখালী স্টেশনে যাত্রাবিরতির দাবিতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ২২ মিনিট সুন্দরবন এক্সপ্রেস নামের ট্রেন থামিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন কয়েক হাজার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, ছাত্র, জনতা, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণির মানুষ। এসময় বিক্ষোভকারীরা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রা বিরতির দাবিতে আল্টিমেটাম দেন। পরে কুমারখালী স্টেশন মাস্টার এসে আশ্বস্ত করলে ট্রেনটি ছেড়ে দেন বিক্ষোভকারীরা।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে স্টেশন চত্বরে বিভিন্ন এলাকার ছাত্র – জনতা জড়ো হতে দেখা যায়। পরে দুপুর ১২ টা ১০ মিনিটে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেসটি ট্রেন পৌছালে বিক্ষোভকারীরা তা থামিয়ে দেন। কেউ কেউ আবার পতাকা হাতে করে উঠে পড়েন ট্রেনে। থামার ২২ মিনিট পরে ট্রেনটি চলে যায়। সুন্দরবন এক্সপ্রেসটি প্রায় ২২ মিনিট থামিয়ে রেখে বিক্ষোভ করেছে কয়েক হাজার নানা শ্রেণির মানুষ বলে জানিয়েছেন কুমারখালী রেলস্টেশন মাস্টার শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, যাত্রা বিরতির দাবিতে বিক্ষোভকারীরা একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে যাত্রাবিরতি চালু করা হবে।
এলাকাবাসী জানায়, গড়াই নদীর কুলঘেঁষে ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমারখালী পৌরসভা। এটি শিল্প প্রসিদ্ধ এবং পর্যটন এলাকা। এখানকার তাঁত ও বস্ত্র শিল্প জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে। এরআগে ১৮২৮ সালে পাবনা জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে কুমারখালী পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। এর আগে যশোরের মধ্যে ছিল। ১৮৫৭ সালে কুমারখালীতে মহকুমা প্রতিষ্ঠা হয়। কুমারখালী মহকুমার অধীনে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি, পাংশা, কুমারখালী, খোকসা ও অধুনালুপ্ত ভালুকা থানা অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৪ বছর পর ১৮৭১ সালে কুমারখালী মহকুমা বিলুপ্ত হলে কুমারখালী থানা হিসেবে জন্ম লাভ করে এবং নবগঠিত কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্ভুক্ত হয়। এ সময় কুষ্টিয়া মহকুমা নদীয়া জেলার সাথে সম্পৃক্ত ছিল।
এই সাংস্কৃতিক জনপদে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, বাউল সম্রাট লালন শাহের আখড়াবাড়ি, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তভিটা, গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি ও স্মৃতিজাদুঘর, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের বীরসেনা বাঘা যতীনের জন্মভিটাসহ সহ আরো অনেক প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, লেখক, শিল্পী, রাজনীতিবীদদের বাড়ি ও স্মৃতি বিজড়িত স্থান।এখানে ব্যবসায়িক কারণে ও পর্যটক হিসাবে দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মানুষ আসা-যাওয়া করে। তবে যাতায়াতের তেমন কোনো সুব্যবস্থা নেই। তবুও নিত্য প্রয়োজনে দুর্ভোগের স্বীকার হয়ে চলাচল করেন তারা। সে কারণে খুলনা থেকে ঢাকাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৭২৫ -৭২৬ এবং বেনাপোল এক্সপ্রেস ৭৯৫ -৭৯৬ ট্রেন ২টি কুমারখালী ষ্টেশন যাত্রাবিরতি দাবি জানান।কুমারখালী তাঁতবোর্ডের উপ মহাব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান জানান, সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার বিশাল কাপুড়িয়ার হাট বসে।
এ দুদিনে আট-দশ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। তাঁর ভাষ্য, হাটটি রেলস্টেশন থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দুরে। ট্রেন চালু হলে ব্যবসা – বাণিজ্য আরো প্রসার হবে।সাংস্কৃতিক জনপদে ট্রেনের যাত্রাবিরতি না থাকাটা দুঃখজন বলে জানান কবি ও নাট্যকার লিটন আব্বাস। তিনি বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় আগত পর্যটকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এক্সপ্রেস ট্রেন চালু হলে আরো সমৃদ্ধ হবে পর্যটন শিল্প।জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন, উপজেলা জামায়েতের আমির আফজাল হোসাইন ও উপজেলা বিএনপির আহবায়ক লুৎফর রহমান বলেন, ‘ বুকের উপর দিয়ে ট্রেন যাবে, কিন্তু থামবেনা। তা হবেনা। কুমারখালী বাসি তা মেনে নেবেনা। আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। তবুও ট্রেন না থামলে সকল ট্রেন থামিয়ে দিয়ে বৃহৎ কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে।বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলাম। তিনি বলেন, যথাযত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
