কুমারখালীর বেপরোয়া জেলে সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় পুলিশ ও প্রশাসন - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীর বেপরোয়া জেলে সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় পুলিশ ও প্রশাসন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: নভেম্বর ৪, ২০২৪

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশের প্রধান প্রজনণ মৌসুম। এ সময় ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ অনুযায়ী আইন অমান্যকারীকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে।তবে আইন অমান্য করে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পদ্মা নদীতে দিনরাত বেঁধে চলছে ইলিশ নিধন। মৎস্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে ইলিশ নিধন করছেন পদ্মাপাড়ের বেপরোয়া কয়েক শত জেলে। নৌকা প্রতি ৫০০ থেকে এক হাজার করে চাঁদা নিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করে স্থানীয় কয়েকটি সিন্ডিকেট চক্র বলে জানান স্থানীয়রা। উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য কার্যালয়ের নিয়মিত যৌথ অভিযানেও থামছেনা ইলিশ নিধন।

এতে পদ্মায় সিন্ডিকেটের চোর পুলিশ খেলার কাছে যেন অনেকটায় অসহায় মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন ও কর্মকর্তারা। আধিপত্য বিস্তারে ঘটছে সংঘর্ষ, হামলা, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের ঘটনা। রয়েছে প্রাণহানির ঘটনাও।গত ২৮ অক্টোবর ভোরে উপজেলার শিলাইদহের শ্রীখোল এলাকায় পদ্মা নদীতে জেলেদের হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা নদীতে নিখোঁজ হন। পরে তাঁদের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌপুলিশ। এঘটনায় আহত হন উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম, কয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর সদস্য ছানোয়ার হোসেন ছলিম ও ৬ নম্বর সদস্য আনোয়ার হোসেন টিটন।নিহতরা হলেন কুমারখালী থানার সহকারী উপপরিদর্শক ( এএসআই) মুকুল হোসেন ও সদরুল হাসান। তবে এঘটনায় পুলিশ ও জেলেদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়।পুলিশ বলছে, নদীপথে উপজেলার চরসাদিপুরে আসামি ধরতে যাওয়ার সময় দুই নৌকার সংঘর্ষে এ ঘটনা ঘটে।

কিন্তু ২৯ অক্টোবর রাতে ৮ জনকে আসামি করে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন আহত উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম।আর জেলেদের ভাষ্য, নদীতে অভিযানের নাম করে ছলিম ও টিটন মেম্বর ৬ পুলিশ নিয়ে এসে জেলেদের কাছ থেকে ইলিশ মাছ ও তেল ছিনিয়ে নেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অজ্ঞাত জেলেরা পুলিশের ওপর হামলা করেন।২৮ অক্টোবর থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শিলাইদহ ও কয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পদ্মায় বালু উত্তোলন, মাছ ধরা, জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় ও আধিপত্য বিস্তারে আওয়ামী লীগের দুইটি পক্ষ রয়েছে। তার মধ্যে একটি পক্ষ্যের নেতৃত্ব দেন জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক স্বপন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত তুষার, কয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আব্দুল খালেক,তার দুই ছেলে রিপন ও শিপন, কয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য সানোয়ার হোসেন ছলিম ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আনোয়ার হোসেন টিটন।

তবে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর পালিয়ে গেছেন স্বপন ও তুষার।অপর পক্ষের নেতৃত্ব দেন বেড় কালোয়া এলাকার কেঁদো শেখের ছেলে ও জেলেদের নেতা ইয়ারুল ইসলাম।১০-১৫ বছর ধরে আধিপত্য বিস্তারের জেরে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি ইয়ারুলের বড় ভাই জিয়ার হোসেন (৪৫) কে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষরা। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক সহ ১৪ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করা হয়। মামলাটি আদালতে চলমান।তবে পদ্মায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি-লুটপাট নিয়ে রয়েছে দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।ইয়ারুল গ্রুপের জেলে নুর ইসলামের স্ত্রী পূর্ণিমা খাতুনের ভাষ্য, নদীতে নামলে আওয়ামী লীগ নেতা খালেক, স্বপন, ছলিম ও টিটন মেম্বরের লোকজন মাছ ও জাল কেড়ে নেয়। ৫ হাজার করে টাকা চাঁদা না দিলে নৌকা পানিতে ডুবিয়ে দেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন, পদ্মায় খালেক, তার ছেলে রিপন ও শিপন, তুষার, ইয়ারুল, এরাই মাছ ধরে খায়। জেলেদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে। এরাই সেদিনে নদীতে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। অভিযোগ অস্বীকার আওয়ামী লীগ নেতা খালেকের ছেলে রিপন বলেন, নদীতে সকল অপকর্ম পরিচালনা করে ইয়ারুল।কয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও সেদিনের হামলায় আহত সানোয়ার হোসেন ছলিমও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জেলেদের নেতা ইয়ারুল পদ্মায় জেলেদের কাছ থেকে প্রতিরাতে নৌকা প্রতি ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা করে চাঁদা তোলে। পদ্মায় সকল অপকর্মের নেতৃত্ব দেন ইয়ারুল। 

তিনি আরো বলেন, ২৮ অক্টোবর রাতে কিছু জেলেদের কাছ থেকে আমরা ( পুলিশ ও মেম্বর) প্রথমে জাল ও মাছ নিয়েছিলাম। তবে কিছুক্ষণ পরে তা ফেরত দিয়েছিলাম। তাঁর ভাষ্য, জেলেরা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা করেছিল।পদ্মায় চাঁদাবাজি ও লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে ২৯ অক্টোবর দুপুরে জেলেদের নেতা ইয়ারুল সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন ও তুষারের নেতৃত্বে খালেক, তার ছেলে রিপন ও শিপন, ছলিম ও টিটন মেম্বর নিয়মিত পদ্মায় জেলেদের কাছ থেকে মাছ, জাল ও নৌকা জিম্মি করে চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছে। সেদিনও পুলিশ নিয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে হামলার শিকার হন। তাঁর ভাষ্য, খবর পেয়ে সেদিন আহত পুলিশতের তিনিই উদ্ধার করেছিল।কয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, উপজেলার কয়া, শিলাইদহ, জগন্নাথপুর ও চরসাদিপুর ইউনিয়নের প্রায় ১০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে পদ্মা নদীর প্রবাহমান রয়েছে। পদ্মাপাড়ের প্রায় ৪৬০ জন নিবন্ধিত এবং ৪৫০ জন অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে। আইন অমান্য করে প্রতিবছরের ন্যায় এবারো বেপরোয়া জেলেরা পদ্মায় ইলিশ নিধন করেছেন। আইন প্রতিপালনে তারা অন্তত ১৫ টি অভিযান পরিচালনা করেছেন। অভিযানে আইন অমান্যকারীদের কাছ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ২৯ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়াও তাদের কাছ থেকে প্রায় ২৭ হাজার মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয় এবং প্রায় ৩৪ কেজি ইলিশ জব্দ করে বিভিন্ন এতিমখানায় প্রদান করা হয়েছে।তাঁর ভাষ্য, পদ্মায় ব্যাপক সিন্ডিকেট রয়েছে।

অভিযানে নামার আগেই জেলেরা খবর পেয়ে যায়। সেখানে প্রশাসন ও জেলেদের চোর পুলিশ খেলা চলে। বেপরোয়া জেলে ও সিন্ডিকেটের কাছে অনেকটায় অসহায় হয়ে পড়েছে আইন ও প্রশাসনের কর্তারা।পদ্মায় পুলিশ হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত এজাহার নামীয় দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পাবনার ঈশ্বর্দীর লক্ষীকুণ্ডা নৌপুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক মো. আকিবুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, পুলিশ হত্যার পিছনের ঘটনা উদঘাটনে গভীর তদন্ত চলছে। আর পদ্মায় সিন্ডিকেট বা চাঁদাবাজির বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে পরে বিস্তারিত বলা যাবে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, পদ্মায় সকল বিষয় নিয়েই তদন্ত চলছে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছেনা।