মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ পদ্মা নদীর কুলঘেঁষে ২২ বর্গমাইল আয়তন নিয়ে গঠিত কুমারখালীর চরসাদীপুর ইউনিয়ন। এখানে প্রায় ২৩ হাজার মানুষের বসবাস। বিভিন্ন সময়ে ভাঙনে প্রায় পাঁচ বর্গমাইল ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ১৭ বর্গকিলোমিটারে বসতি এবং তিন ও দুই ফসলি কৃষি জমি। সেখানে আইন অমাণ্য করে গড়ে ওঠেছে প্রায় ৩৩ টি অবৈধ ইটভাটা। যার মধ্যে অন্তত ১৯টিতে ব্যবহার হচ্ছে টিনের ড্রাম চিমনি। এছাড়াও ইউনিয়ন ঘেঁষে কুষ্টিয়া সদর ও পাবনা অংশজুড়ে রয়েছে আরো অন্তত ৭ টি ভাটা। যার সব গুলোই অবৈধ। এসব ভাটায় দিন-রাত বেঁধে কৃষি জমি ও নদী কুলের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে অবৈধযানে করে। জ্বালানি হিসেবে পুড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন গাছের কাঠ। এতে কৃষি জমির পরিমান কমে যাচ্ছে। ভাটার আশপাশের ফসল ও ফসলি জমি হুমকিতে পড়েছে।
অবাধে অবৈধযান চলাচলে ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে অবৈধ ভাটার সংখ্যা বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বাসিন্দারা বলছেন, নদীর কারনে জেলা ও উপজেলা শহরের সাথে চর সাদিপুরের যোগাযোগের একমাত্র যানবাহন নৌকা। ফলে প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় অসাধু ব্যক্তিরা কৃষি জমিতে গড়ে তুলছেন অবৈধ ইটভাটা। ভাটা গুলোর কোনো বৈধতা নেই। ভাটা মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের কাছে জিম্মি এলাকাবাসী। জনস্বার্থে অবৈধ ভাটা বন্ধের দাবি জানান। ভাটা মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ইউনিয়নের শ্রীকোল এলাকায় ৭, ভৈরবপাড়ায় ১১, সাদিপুরে ৯, আটরশিতে ৪, মারিয়াপাড়ায় ২, ঘোষপুর ৪ টিসহ চর সাদিপুর এলাকায় অন্তত ৪০টি ইটভাটা রয়েছে।
যার মধ্যে এবিএস, ৫আরবি, এমডিএল, এমএসডি, কেআরবি, এমএমসি, এবিসি, ভিএমভি, এএসবি সহ নামে-বেনামে অন্তত ১৯ টি ড্রাম চিমনির ভাটা রয়েছে। অন্যান্য ভাটা গুলোরও নেই বৈধ ছাড়পত্র। তাঁদের ভাষ্য, কায়দা কৌশল করেই চলছে এসব ভাটা। এসব ভাটায় আকার ভেদে জ্বালানি হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৪০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। চরসাদিপুর ইউনিয়ন ভাটা মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. শহিদ বলেন, ১৩ বছর আগে প্রথম ভাটা করেছিলাম। দিনেদিনে ভাটার সংখ্যা বাড়ছে। তাঁর জানামতে বর্তমানে সেখানে অন্তত ৩০ -৩৫ টি ভাটা চলছে। যার ১৯ টিই ড্রাম চিমনির। বিভিন্ন জনকে ম্যানেজ করেই ভাটা চলছে বলে জানান তিনি। গত সোমবার (২ ডিসেম্বর) বিকেলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পদ্মানদীর কুল ও চরাঞ্চলে কলা, সবজি, ডালসহ হরেকরকম ফসল চাষ করেছেন কৃষকরা। ফসলের মাঠ ঘিরে গড়ে উঠেছে চিমনি ও ড্রাম চিমনি ইটভাটা। প্রতি ভাটায় প্রায় ১৫ -২০ বিঘা কৃষি জমি ব্যবহার করা হয়েছে।
ভাটায় পুড়ছে কয়লার বদলে কাঠ। ট্রলিসহ বিভিন্ন অবৈধযানে পদ্মানদী কুলের কৃষি জমি থেকে মাটি আনা হচ্ছে ভাটায়। এসময় ভৈরবপাড়া গ্রামের কৃষক রজব আলী বলেন, আমার সাড়ে চার বিঘা ফসলি জমি জোড় করে দখল করে অবৈধ ইট ভাটা চালাচ্ছেন প্রভাবশালী মো. শহিদ। নিজের জমি উদ্ধার ও অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা,পরিবেশ অধিদপ্তর, থানা, আদালতে মামলা করে প্রতিকার পাইনি। সাদিপুর গ্রামের আবুল হোসেন মকুল বলেন, সরু রাস্তায় বড় বড় ট্রাক – ট্রলি চলাচল করে। রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। রাস্তার পাশের ঘর- বাড়ি গুলোতে ধুলাবালিতে পুরিপূর্ণ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুর্বিষহ জীবন – যাপন করছেন মানুষ। ভাটা মালিকদের কাছে জিম্মি সেখানকার বাসিন্দারা। নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক চাকুরিজীবি জানান, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে চরসাদিপুর ইউনিয়ন এলাকায় প্রায় ৪০টি অবৈধ ভাটা গড়ে উঠেছে। কৃষি জমি জবর – দখল করে ভাটা চালাচ্ছেন প্রভাবশালীরা। জানা গেছে, প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় চরসাদিপুরে ইটভাটার ব্যবসা লাভজনক।
সেজন্য চলতি বছরে ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তোফাজ্জেল হোসেন এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ওমর আলী পৃথক দুইটি ড্রাম চিমনির ভাটা করেছেন। মুঠোফোনে তারা বলেন, অনেকেই অবৈধ ভাবে ভাটা চালাচ্ছেন। সেজন্য তারাও প্রথমবারের মতো শুরু করেছেন। তাদের ভাষ্য, ভাটার ব্যবসা কখনও বৈধ হয়না। সাদিপুর এলাকার ড্রাম চিমনি দ্বারা চালিত এবিএস ভাটার মালিক সেলিম সরদার। তিনি বলেন, ফিট চিমনি বা হাওয়া ভাটায় খরচ বেশি। সেজন্য প্রতিবছর ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা দিয়েই ড্রাম চিমনি চালাচ্ছেন। চরসাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মেছের আলী খাঁ জানান, বছর বছর ভাটা বাড়ছে। অতিরিক্ত ভাটা ও অবৈধযান চলাচলে মানুষের খুবই ভোগান্ত হচ্ছে। তাঁর কথা ভাটা মালিকরা শোনেনা। প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেও কোনো কাজ হয়না। জানা গেছে, শুধু চর সাদিপুর নয়, উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নে ১৩ টি, যদুবয়রা ইউনিয়নে ৯ টি, জগন্নাথপুরে ২, সদকী ৪, বাগুলাট ১, চাপড়া ৬, চাদপুর ২ টি ও পান্টি ২ টিসহ উপজেলায় অন্তত ৭৯ টি ইটভাটা রয়েছে।
যার ৭০ টি অবৈধ। সেখানে কয়লার বদলে পুড়ানো হচ্ছে কাঠ। কুমারখালী সরকারি কলেজের ভূগোল বিভাগের শিক্ষক কায়সার রেজা জানান, কাঠ পোড়ানো ধোঁয়া বা যেকোনো ধোঁয়ার কারণে কার্বন ডাই অক্সিজেন, নাইট্রোজেন অক্সিজেন, সালফার ডাই অক্সিজেনের যে গ্যাস তৈরি হয়, তা ভবিষ্যতে এসিড বৃষ্টি হতে পারে, যা খুবই ক্ষতিকর। এছাড়াও কালোধোঁয়া গ্রীন হাউজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কাঠ পোড়ালে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। হতে পারে ক্ষতিকর এসিড বৃষ্টি বলে জানান কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ – পরিচালক ( ভারপ্রাপ্ত) মো. হাবিবুল বাসার ( সিনিয়র কেমিষ্ট)। তিনি বলেন, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভাটা উচ্ছেদ ও জরিমানা করা হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারনে চরসাদিপুরে যন্ত্র দিয়ে ভাটা গুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়না। তবে অবৈধ ভাটা বন্ধের জন্য মালিকদের সাথে আলাপ আলোচনা করছেন বলে জানান তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, খুব দ্রুতই ড্রাম চিমনির ভাটা গুলো ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হবে। বৈধ কাগজপত্রাদি না থাকলে অন্যান্য গুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য, উপজেলায় মোট ৯ টি বৈধ ভাটা আছে।
