বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে চাহিদামত সার না পেয়ে ডিলারের লোকজন ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় বাগবিতণ্ডা ও হট্টগোল জড়িয়ে পড়েছেন কয়েকশত কৃষক। গতকাল রবিবার (৪ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের নিদেনবাজার এলাকার বিসিআইসি ডিলার পয়েন্টে এ ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং দোকান ঘর বন্ধ করে সটকে পড়েন ডিলারের লোকজন। এছাড়াও উপস্থিত কৃষকদের আগামী মঙ্গলবার ন্যায্যমূল্যে সার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অগ্রিম নামের তালিকা তৈরি করেন কৃষি কর্মকর্তারা। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কুমারখালী শহর-পান্টিবাজার সড়কের নিদেনবাজার এলাকায় অবস্থিত বিসিআইসির অনুমোদিত লেক্সাস ইন্টারন্যাশনাল নামের সারের ডিলার পয়েন্টে।
সড়ক ঘেঁষে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক শত নানাবয়সি কৃষক। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে, লাইন বাদে সার প্রদান, চাহিদামত সার না দেওয়া এবং কৃষক বাদ রেখে সাব ডিলারদের আগে সার দেওয়া নিয়ে তারা থেমেথেমে বাগবিতণ্ডা ও হট্টগোলে জড়িয়ে পড়ছেন। আরো দেখা গেছে, দুপুর ১২টার দিকে সেখানে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কাওসার আলীসহ কয়েকজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপস্থিত হন। তখন কৃষকরা কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। প্রায় ১৬ মিনিট বাগবিতণ্ডা শেষে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে উপস্থিত কৃষকদের মাঝে এক বস্তা করে ন্যায্যমূল্যে সার প্রদান শুরু করা হয়। এরপর দুপুর একটার দিকে ডিএপি সার শেষ হয়ে গেলে ফের শুরু হয় বাগবিতণ্ডা, হট্টগোল ও হৈচৈ। এ সময় দোকান বন্ধ করে সটকে পড়েন ডিলারের লোকজন। পরে আগামী মঙ্গলবার সার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্তত ৪৪ জনের নাম লিপিবদ্ধ করেন কৃষি কর্মকর্তারা। এ সময় যদুবয়রা ইউনিয়নের বহলবাড়িয়া গ্রামের খয়বার শেখের ছেলে আব্দুর রশিদ (৬০) বলেন, ৪ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ।
আড়াই ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সার পেলাম না। আগামী মঙ্গলবার সার পাওয়ার আশায় নাম লিখিয়েছি। লক্ষীপুর গ্রামের আতাই উদ্দিনের ছেলে উকিল উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, লাগবে ডিএপি সার। দিল ইউরিয়া। এভাবে জন কামায় করে লাইনে সার নিয়ে কি চাষাবাদ হয়! তার ভাষ্য, ডিলাররা সার দেয়না। অথচ বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা বেশি দিলেই সাব ডিলাররা সার দেয়। ওরা ( সাব ডিলার) সার পাই কোথায়। জোতমোড়া গ্রামের কৃষক শাহিন মোল্লা বলেন, কৃষকের না দিয়ে বেশি দামে বেচার জন্য ১০ বস্তা করে সার সাব ডিলারদের দিয়ে দিচ্ছে। এসব নিয়ে কিছুক্ষণ পরপরই হট্টগোল – হৈচৈ হচ্ছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সার না পেয়ে চলে আসলাম। নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক সাব ডিলার বলেন, সকালে ১০ বস্তা করে সার নিয়ে এসে ন্যায্য দামে বিক্রি করেছি। ১০ কেজির বেশি কাউকে সার দিতে পারিনি।
হট্টগোল ও হৈচৈয়ের কথা স্বীকার করে যদুবয়রা বিসিআইসি সার ডিলার পয়েন্টের ব্যবস্থাপক মো. মুসা বলেন, এখন ডিএপি সারের চাহিদা বেশি। ৩৯৯ বস্তা ডিএপি সার ছিল। নিয়ম অনুযায়ী ৫০ বস্তা ডিলাররা নিয়ে গেছে। বাকী সার লাইন ধরিয়ে কৃষকদের দেওয়া হয়েছে। তবে কৃষকের অতিরিক্ত চাপ থাকায় দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে থাকা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কাওসার আলী বলেন, সাব ডিলাররা আগে সার নেওয়ায় এবং লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে কৃষকরা কয়েকদফা উত্তেজিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। পরে তাঁদের মঙ্গলবার সার প্রদানের আশ্বাস দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তার ভাষ্য, ৪৪ জনের কৃষকের নামের অগ্রিম তালিকা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম। তবে তিনি বলেন, সারের কোনো সংকট নেই।
কৃষকরা মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহার করায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের পরিমিত সার ব্যবহারে সচেতন করার পাশাপাশি ডিলার ও সাব ডিলারদের নজরদারি করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, উপজেলায় কৃষিজমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে চার হাজার ৯২০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। চলতি মাসে ৩৫০ মেট্রিকটন টিএসপি, ৪৫০ মেট্রিকটন ডিএপি, ৩০০ মেট্রিকটন এমওপি এবং এক হাজার মেট্রিকটন ইউরিয়া সারের বরাদ্দ রয়েছে। ডিসেম্বর মাসেও সমপরিমাণ বরাদ্দ ছিল এই উপজেলায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, যদুবয়রা ডিলার পয়েন্টে হট্টগোলের খবর পেয়ে পুলিশের সহযোগীতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সার নিয়ে কোনো কারসাজি হচ্ছে কি না? তা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে।
