কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ শীত এলেই মাঠ জুড়ে হলুদ সরিষা ফুলের সমারোহ প্রকৃতিকে করে তোলে মনোমুগ্ধকর। যতদূর চোখ যায়, দেখা মেলে সবুজ আর হলুদের এক অপরুপ দৃশ্য । আর এই সৌন্দর্যের আড়ালেই চলছে এক নীরব কর্মযজ্ঞ। সরিষা ক্ষেতের পাশে স্থাপন করা হয়েছে মৌবাক্স। মৌমাছিরা সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত সরিষার ফুলে ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহের পাশাপাশি পরাগায়নের কাজ করে। এতে যেমন বাড়ছে সরিষার ফলন, তেমনি সংগ্রহ হচ্ছে খাঁটি ও মানসম্মত মধু। চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নে প্রায় ৩৮০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে।
এসব সরিষা খেতে স্থাপন করা মৌবাক্সের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরাগায়ন হওয়ায় সরিষার ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে সরিষা ফুল থেকে উৎপাদিত হচ্ছে মধু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহ সহ বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। মধু খামারি আনিসুর রহমান জানান, প্রায় আড়াই মাস আগে তিনি সরিষা ক্ষেতের পাশে ২২০টি মৌবাক্স স্থাপন করেন। ৮-১০ দিন পরপর প্রতিটি বাক্স থেকে এক থেকে দেড় কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়। এসব বাক্স থেকে গড়ে প্রায় ৮ মণ মধু সংগ্রহ করেছেন তিনি। সংগৃহীত মধু প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এই মধু স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তার খামারে ৩ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে গড়ে দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা আয় হচ্ছে, যা তার জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, কৃত্রিমভাবে মৌমাছি চাষের ফলে সরিষার ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে প্রতি বিঘায় সরিষার উৎপাদন ছিল ৩ থেকে সাড়ে ৩ মণ, বর্তমানে সঠিক ও পর্যাপ্ত পরাগায়নের কারণে তা বেড়ে ৬ থেকে ৮ মণে পৌঁছেছে। ফলন বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা আগের তুলনায় বেশি লাভবান হচ্ছেন এবং আরও বেশি জমিতে সরিষা চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। একই সঙ্গে সুলভ মূল্যে খাঁটি মধু হাতের নাগালে পাওয়ায় তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নে ৩৮০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌবাক্স স্থাপনের ফলে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহের পাশাপাশি সুষ্ঠু পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এর ফলে সরিষার ফলন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে এবং উৎপাদিত মধু স্থানীয় চাহিদা পূরণ সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে বলে জানান তিনি। কুমারখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাইসুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে সরিষা আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৮৯০ হেক্টর। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকেরা ৩ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন । এর ধারাবাহিকতায় জগন্নাথপুর ইউনিয়নের চর-জগন্নাথপুর এলাকায় প্রায় সাড়ে ৩শ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে । পাশাপাশি এ চর এলাকায় মৌচাষিরা প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি মৌবাক্স স্থাপন করেছেন। এর ফলে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মধু উৎপাদনও বাড়ছে। এ বছর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন সরিষা এবং ১ হাজার ৫শ মেট্রিক টন সরিষার তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থাপিত মৌবাক্স থেকে প্রায় ৫ থেকে ৬ টন মধু উৎপাদন সম্ভব হবে, যা দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করবে বলে জানান তিনি।
