কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুমারখালী শিলাইদ ইউনিয়নের খোরশেদপুর এলাকার একটি মন্দিরের পুকুরের একাংশ পাইলিং ও বালি দিয়ে ভরাট করে দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে।
দখল ঠেকাতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছে মন্দির কমিটি। জেলা প্রশাসক ও গোপীনাথ দেব বিগ্রহ মন্দির সুত্রে জানা যায়, প্রায় চার শতাধিক বছর পূর্বে রানী ভবানীর শাসনামলে শিলাইদহের খোরশেদপুর বাজারের পাশে শ্রী শ্রী গোপীনাথ দেব বিগ্রহ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। কালের পরিক্রমায় এর বেশ কিছু অংশ মানুষের দখলে চলে গেলেও আজও কালের সাক্ষী হিসেবে সমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে বেষ্টনী ঘেরা মন্দির প্রাঙ্গণ এবং এটির উত্তর ও উত্তর-দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বিশাল পরিসরের দুইটি পুকুর।
গোপীনাথ দেব বিদ্রোহ মন্দির কমিটির সরবরাহকৃত জমির কাগজপত্র সুত্রে দেখা গেছে, মন্দিরের উত্তর দক্ষিণাংশে(১৪)নং খোরশেদপুর মৌজার ৩৫৯ নং খতিয়ানের ২৬৪১ নম্বর দাগে ২.৮২ একর জমির উপর একটি পুকুর রয়েছে। পরচা অনুযায়ী ঐ পুকুর শ্রী শ্রী গোপীনাথ দেব-বিগ্রহ মন্দিরের দেবওর সম্পত্তি। উল্লেখিত পুকুরের পূর্ব সীমানার একাংশ শিলাইদা ইউনিয়নের খোরশেদপুর গ্রামের মৃত সাদেক আলীর পুত্র মোঃ আব্দুস সামাদ ব্যক্তিগত সম্পত্তি উল্লেখপূর্ব সহকারি জর্জ আদালত, কুমারখালীতে দেং ৩৯/২০৪ নং মোকদ্দমা রুজু করে। মামলায় পরাজিত হলে উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে জেলা জর্জ আদালতে আপিল করেন। গত-৩০/০৮/২০১৬-ইং তারিখে জেলা জজ আদালত কর্তৃক প্রদান কৃত রায়ে পুনরায় পরাজিত হলে আপিলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের সিভিল ডিভিসনে ৭৫৬/১৭ মোকদ্দমা দায়ের করেন। বর্তমানে মামলাটি হাইকোর্টে চলমান রয়েছে।
এই অবস্থায় উক্ত জমিতে লোকজন নিয়ে বালি দিয়ে ভরাট কার্য চালাচ্ছেন অভিযুক্ত আব্দুস সামাদ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খোরশেদপুর বাজার থেকে মাজগ্রাম অভিমুখী পাকা রাস্তার কোল ঘেছে বিশাল আকৃতির একটি পুকুর। পুকুরটির উত্তর-পূর্ব পাড় ঘেঁষে কিছু অংশে বাঁশ দিয়ে পাইলিং পূর্বক বালি দিয়ে ভরাটের কাজ চলছে।
এছাড়াও একই পাড়ের দক্ষিণ-পূর্বে পাকা রাস্তার কোল ঘেষে নির্মাণাধীন রয়েছে বেশ কয়েকটি কলাম। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কলাম গুলি দোকান নির্মাণের জন্য তোলা হচ্ছে। তারা বলেন কয়েকশত বছরের পুরনো গোপীনাথ মন্দিরের মালিকানাধীন এই পুকুরে আমরা ছোটবেলা থেকেই মাছ চাষ করতে দেখে আসছি ।
মন্দির কমিটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থের বিনিময়ে মাছ চাষের জন্য পুকুরটি লিজ দিয়ে থাকে। কিন্তু আব্দুস সামাদ পুকুরটির পূর্বপাশের কিছু অংশ নিজ সম্পত্তি দাবি করে বালি দিয়ে ভরাট ও দোকান নির্মাণ করছে। অভিযুক্ত আব্দুস সামাদের ভাই ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান পাইলিং করা অংশটি নিজেদের পৈত্রিক দাবি করে বলেন, দীর্ঘদিন মাছ চাষ করার ফলে পাড়সহ জমির কিছু অংশ ভেঙে পুকুরে বিলীন হয়েছে। অতীতে সার্ভেয়ার দিয়ে মাপামাপি করে পিলার স্থাপন করা হয়।
পিলার মোতাবেক পাইলিং করে ভরাট করা হচ্ছে। মামলা নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে সুমন আলী নামে অন্য আরেক ভাই জানান, পুকুরের জমির অংশ নিয়ে করা মামলায় এখন পর্যন্ত দুটি রায় দিয়েছে কোর্ট। যার একটি রায় আমাদের এবং অন্যটিতে গোপীনাথ মন্দির কমিটির পক্ষে য়ায়।উচ্চ আদালতে চলমান মামলার রায়টি ও তাদের স্বপক্ষে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শিলাইদহের শ্রী শ্রী গোপীনাথ দেব বিগ্রহ মন্দির কমিটির সহকারী সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা সজীব রায় জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি, উচ্চ আদালতে মামলা চলমান অবস্থায়ই জোরপূর্বক লোকজন নিয়ে বালি দিয়ে ভরাট করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে মন্দির কমিটির নিষেধের তোয়াক্কা না করলে, নিষ্পত্তির আশায় মন্দির কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দ্বারস্থ হই। নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশ মোতাবেক সহকারী কমিশনার,ভূমি,আমিরুল আরাফাত মহদয় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
নির্দেশ মোতাবেক সার্ভেয়ার দিয়ে মাপা হয় জলাশয়। পরবর্তীতে আমিরুল আরাফাত মহোদয়ের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের বসা-বাসিও হয়। এতেও নিষ্পত্তি না হওয়ায় আমরা জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হই । নিষ্পত্তি না হওয়া অবধি ভরাট বন্ধ রাখা ও ভরাট কৃত বালি অপসারণের দাবিও জানান তিনি।
এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার, ভূমি, আমিরুল আরাফাতের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সিভিল ডিভিশনে চলমান মামলা ও মৌজা সমস্যার কারণে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। ইউএনও স্যার মন্দির কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন। বিষয়টি নিষ্পত্তিতে চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। মামলা চলমান থাকতে বালি দিয়ে পুকুর ভরাট প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম মিকাইল ইসলাম বলেন, সিভিল ডিভিশনে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বালি ভরাট চলমান থাকলে পুলিশ পাঠিয়ে সেটি বন্ধ করার আশ্বাস দেন মন্দির কমিটির সভাপতির পদে থাকা প্রশাসনিক এই কর্মকর্তা।
