কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ পূর্ব নোটিশ ছাড়াই আদালতের নির্দেশে উচ্ছেদের অভিযানে পাঁচ সহোদরের ঘরবাড়ি ভেঙে দেন প্রশাসনের একটি দল। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে কয়েক শত বিক্ষিপ্ত জনতা অভিযান স্থলে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে দ্রুত পালিয়ে যান ম্যাজিস্ট্রেটসহ আভিযানিক দলটি। পরে উত্তেজিত জনতা বাদীপক্ষের আধাপাকা টিনশেড ঘরে ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সদকী ইউনিয়নের বাটিকামারা এলাকায় গতকাল সোমবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলে এ ঘটনা। এরপর বিকেল ৫ টার দিকে কয়েক শত বিক্ষিপ্ত জনতা ক্ষতিগ্রস্থ পাঁচ সহোদরকে নিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেন। স্থানীয়রা জানায়, কুমারখালীর তরুন মোড়-তারাপুর সড়কের বাটিকামারা এলাকায় ১০ শতাংশ সরকারের এক নম্বর খতিয়ানের খাস জমি রয়েছে। তারমধ্যে ৫ শতাংশ জমিতে প্রায় ৩০ বছর আগে ওই গ্রামের দিনমজুর ইসমাইল শেখ বসবাস শুরু করেন।
তাঁর বসবাসের প্রায় পাঁচ বছর পরে অবশিষ্ট ৫ শতাংশে বাস শুরু করেন মৃত আছাম উদ্দিনের স্ত্রী বুলু খাতুন। বুলু আওয়ামী লীগের এক সাবেক সংসদ সদস্যের বাড়িতে কাজ করতেন। ১৯৯৫ – ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাঁটিয়ে ১০ শতাংশ জমি বুলু খাতুন নিজের নামে স্থায়ী বন্দোবস্ত নেন। এরপর ২০০২ সালে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে বুলুর কাছ থেকে পাঁচ শতাংশ জমি ক্রয় করেন ইসমাইল শেখ। সেখানে ইসমাইলের স্ত্রী আমিরন নেছা ও তাঁদের পাঁচ সন্তান সাজু, রাজু, সাইদ, লালন শেখ ও কুতুব উদ্দিন বসবাস করছেন। এরপর ২০১৭ সালে কুষ্টিয়া আদালতে বুলু খাতুনকে দিয়ে উচ্ছেদের মামলা করেন তাঁর নাতি ছেলে রাজিব হোসেন। আদালত ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর পাঁচ সহোদরের জমি থেকে উচ্ছেদের আদেশ দেন। তবে ওই সহোদরের উচ্ছেদের কোনো নোটিশ না করেই গতকাল সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদিত্য পাল অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে প্রায় তিনটি ঘর উচ্ছেদের পর বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে কয়েক শত বিক্ষিপ্ত জনতা ঘটনাস্থলে পৌছে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তখন দ্রুত আভিযানিক দল নিয়ে পালিয়ে যান ম্যাজিস্ট্রেট।
পরে বিক্ষিপ্ত জনতা বুলুর নাতি রাজিবের ঘরবাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ইসমাইল শেখের ছেলেদের তিনটি ঘর ভেঙে মাটিতে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট দুইটি ঘরের চাল থাকলেও বেড়া ও ভিতরের মালামাল নেই। আর বিক্ষিপ্ত জনতা রাজিবের ঘরবাড়িতে ভাঙচুর করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে পুলিশ। এসময় ইসমাইলের স্ত্রী আমিরন নেছা দুচোখের জল ছেড় দিয়ে বলেন, ‘ব্যাটা আমার সব শ্যাষ। আর কিছুই নাই। কোনে যাবো। থাকার যাগাও নাই। ছোয়ালরাও সবাই দিনমজুর। কিডা আমারে দেখবিনি। গরীরের পক্ষে কেউ নাই।’ তাঁর ছেলে সাজু শেখ বলেন, ৩০ বছর আগে এখানে সরকারি পুকুর ছিল। আমরায় প্রথমে বাস শুরু করি। কিন্তু রাজিব আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনকে টাকা দিয়ে জমি বন্দোবস্ত নিয়েছে। পরে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনিছি। তবুও কোর্টে মামলা করে মিথ্যা রায় নিয়ে সব ভাঙে দিছে। আমি এর বিচার চাই। সাইদ শেখ বলেন, আদালত আগে থেকে কোনো নোটিশ করিনি। আজ হঠাৎ করে ভাঙচুর চালিয়েছে। আমি এর বিচার চাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী জানান, ইসমাইল শেখের জমি রাজিব আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ও টাকা খরচ করে দখল করার চেষ্টা করছে।
জনগণের বাধার মুখে ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ পালিয়েছে। গরীবের উপর জুলুম করার প্রতিবাদে গ্রামবাসী রাজিবের বাড়িতে ভাঙচুর করেছে। জানতে চাইলে অভিযুক্ত রাজিব হোসেন বলেন, সরকার আমার নানি ও নানার নামে বন্দোবস্ত দিছে ১০ শতাংশ জমি। তারমধ্যে পাঁচ শতক ওরা জোর করে দখল করেছিল। মামলার পর আজ আদালত উচ্ছেদ চালিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, উচ্ছেদে ইসমাইলের ছেলেরা সরকারি কাজে বাঁধা দিয়ে তাঁর বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট করেছে। তিনি এর বিচার চান। তবে এবিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি পালিয়ে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেট আদিত্য পাল। কুমারখালী থানার ওসি মো. সোলায়মান শেখ বলেন, আদালতের নির্দেশে উচ্ছেদ অভিযান চলছিল। সেখানে পূর্ব কোনো নোটিশ না থাকায় জনরোষ সৃষ্টি হয় এবং অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত আছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলাম। আর এসব ঘটনার কিছুই জানিনা বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান।
