কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ট্রেনের ধাক্কায় আহত সরকারি কর্মচারী মারা গেছেন। গতকাল রোববার (২৯ মার্চ) বিকেল পৌণে ৪টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। নিহত ব্যক্তির নাম শফিকুল ইসলাম (৫২)। তিনি কুমারখালী উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী ও উপজেলার সদকী ইউনিয়নের ঘাঁসখাল গ্রামের সেকেন্দার আলীর ছেলে ছিলেন। এরআগে, দুপুর ১২টার দিকে কুষ্টিয়া – রাজবাড়ী রেলপথের কুমারখালী ফুলতলা এলাকায় সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে মোটরসাইকেল ধাক্কা লাগে।
এতে ছিটকে পড়ে তিনি গুরুতর আহত হলে স্থানীয়রা প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের নিয়ে যান। এ তথ্য নিশ্চিত করেন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক (আরএমও) হোচেন ইমাম। তিনি বলেন, গুরুতর অবস্থায় শফিফুলকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। মাথা, পাসহ বিভিন্ন স্থানে ক্ষত রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। জানা গেছে, কুষ্টিয়ার-রাজবাড়ী রেলপথের কুমারখালী রেলস্টেশনের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত ফুলতলা মোড়।
পাশেই কুমারখালী সরকারি কলেজের অবস্থান হওয়ায় কলেজ মোড় নামেও পরিচিত স্থানটি। এটি কুমারখালী শহর, উপজেলা পরিষদ চত্বর, থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সপ্তাহিক হাটে যাতায়াতের বিকল্প সড়কের মোড়। এই মোড় দিয়ে প্রতিদিনই হাজার হাজার নানা শ্রেণিপেশার মানুষ চলাচল করে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়ে নেই রেলগেট, গেটম্যান কিংবা সাইনবোর্ড বা পাহাড়ার। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা। গেলবছরের ২১ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৬২৬ নম্বর ট্রেনের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেলের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শহিদুল ইসলাম (৪০) নামের এক যুবদল নেতা আহত হয়ে হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়েছিলেন। এছাড়াও পাশে থাকা আরো একটি মোটরসাইকেলসহ দুইটি মোটরসাইকেল দুমড়ে মুচড়ে যায়।
সুস্থ ও নিরাপদে চলাচলের জন্য দ্রুত রেলগেট স্থাপনের দাবি জানান স্থানীয়রা। আহত শহিদুল উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি এবং হাসিমপুর গ্রামের মৃত সামছুদ্দিনের ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দুপুর ১২টার দিকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি হর্ণ বাজিয়ে দ্রুতগতিতে রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়ার দিকে যাচ্ছিল। গেট না থাকায় সরকারি কর্মচারী শফিকুল মোটরসাইকেলে ঝুঁকি নিয়ে ফুলতলা মোড় পার হওয়ার চেষ্টা করেন। তখন মুহূর্তেই ট্রেন এসে ধাক্কা দিলে দুর্ঘটনাটি ঘটে। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ফুলতলা মোড়ে নেই রেলগেট, গেটম্যান, সাইনবোর্ড কিংবা পাহাড়াদার।
ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেছে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ ও যানবাহন। এ সময় কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত মিষ্টি ব্যবসায়ী কাজল হোসেন (৩১) বলেন, রেলগেট নেই। নিরাপত্তা কর্মীও নেই। প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে। আজ একজন মারা গেছেন। এরআগেও অনেকেই আহত হয়ে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। রেলগেট নেই। তাই এদিক-সেদিক খেলাল করে চলাচল করার কথা জানান ভ্যানচালক মেজবর রহমান। তিনি বলেন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ মোড় এটি। স্কুল কলেজের ছাত্র, ছাত্রী, স্যার, ব্যাপারীসহ প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে। কিন্তু এখানে জীবনের নিরাপত্তা নেই। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
একটি গেট হলে সকলেরই ভালো হয়। ফুলতলা মোড়ে প্রায় ৯ বছর ধরে কলম, খাতা ও ফটোকপির ব্যবসা করছেন আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, গেট না থাকায় ট্রেন আসছে জেনেও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে মানুষ। ঝুঁকি নিয়ে চলতে গিয়ে প্রায় দিনই মানুষ বিপদের সম্মুখীন হন। অনেকই পার হতে না পেরে গাড়ি ফেলে লাফিয়ে কোনোমতো প্রাণে বাঁচে ফেরেন। যুবদল নেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক থেকে বাড়ির দিকে ফিরছিলাম। পথিমধ্যে রেললাইনের মাঝামাঝি পৌছালে ট্রেনটি খুব কাছাকাছি চলে আসে। তখন মোটরসাইকেলটি পিছানোর চেষ্টা করি। কিন্তু পিছনে আরেকটি মোটরসাইকেল থাকায় পিছানো আর সম্ভব হয়নি। সেসময় দিকবেদিক হারিয়ে লাফ মারি আর ট্রেন এসে গাড়িটিকে ধাক্কা দেয়। এতে আমার হাত কেটে গেছে, পায়ে আঘাত লেগেছিলল।
তাঁর ভাষ্য, গেট বসানো থাকলে ঝ্ধুসঢ়;ঁকি নিতাম না। দ্রুত গেট স্থাপন করা দরকার। মাঝেমাঝে দুর্ঘটনার কথা স্বীকার করে কুমারখালী রেলস্টেশনের মাস্টার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি দুর্ঘটনায় একজন নিহতের খবর শুনেছি। প্রকৃতপক্ষে ফুলতলা এলাকাটি রেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত। সেজন্য গেট স্থাপন হয়নি। তবে স্থানীয়রা লিখিতভাবে অভিযোগ করলে তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হবে।
উপজেলা প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, অফিসের কাজে গিয়ে ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার এক সহকর্মী মারা গেছেন। সেখানে রেলপথ আছে, অথচ গেট বা নিরাপত্তা না থাকাটা দুঃখজনক। সরকারি কর্মচারী নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করে ফুলতলা এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার।
