মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ চারিদিকে বাঁশের ব্যারিকেড। ভিতরে ঢোল, কাঁশিসহ অন্যান্য বাদ্য যন্ত্রের তালেতালে প্রতিপক্ষ দাদা আবেদ আলীকে (৫০) ঘায়েল করতে শক্ত হাতে লাঠির ভেলকি ও কেরামতি দেখাচ্ছে নাতি ফাহিম শেখ (১১)। এযেন দাদা-নাতির সম্পর্ক ভুলে অস্তিত্ব রক্ষায় দুজনের চলছে তুমুল লড়াই। আর তাঁদের লাঠির ভেলকি দেখে আনন্দ উপভোগ করছেন ব্যারিকেডের বাইরে থাকা নানান বয়সী কয়েকশত দর্শক। লাঠিয়ালদের উৎসসাহদানে দিচ্ছেন দুহাতে করতালি।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন আহমেদ শিক্ষাপল্লী পার্কের সামনের ফাঁকা মাঠে গিয়ে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে এদৃশ্য দেখা যায়। সেখানে নববর্ষকে বরণ করতে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা, সাপখলা, বানর ও পুতুল নাচ, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং গ্রামীণ মেলা ও লোকসংগীতের আয়োজন করে আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন।
লাঠিয়াল আবেদ আলী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের বষীগ্রামের বাসিন্দা। তাঁর নাতি ফাহিম ১৪৭ নম্বর আদর্শ সরকারি প্রাথমমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে দাদার খেলা দেখে অনুপ্রেরিত হয়ে প্রায় চার বছর ধরে লাঠিখেলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফাহিম বলে, দাদার লাঠিখেলা দেখতে খুব ভালো লাগে। এই খেলায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কৌশল শেখা যায়। মানুষও খুব আনন্দ পায়। সেজন্য চার বছর ধরে দাদার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে লাঠিখেলা প্রদর্শন করেছে সে।
ফাহিমের দাদা আবেদ আলী বলেন, খুব ছোট বেলা থেকেই কৃষিকাজের পাশাপাশি লাঠিখেলার দলের সঙ্গে বেড়িয়ে আসছি। এখন আর এ খেলার জন্য লোক পাওয়া যায়না। সরকারি-বেসরকারিভাবেও কোনো উদ্যোগ নেই। তাই লাঠিয়াল হিসেবে বংশ রক্ষায় নাতিকে নিয়ে বেড়ায় সাথেসঙ্গে। আলাউদ্দিন আহমেদ ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক মো. আরিফুজ্জামান বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদ গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা, সাপখেলা, বানর ও পুতুল নাচের চমৎকার আয়োজন করেছে। দাদা-নাতির লাঠির তুমুল লড়াইয়ে দর্শক মাতোয়ারা।
উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রাম থেকে আগত লাঠিয়াল জাকির জোয়ার্দার (৬০) বলেন, ৩০ বছর ধরে লাঠিখেলা চালিয়ে আসছি। ১৫-২০ বছর আগে লাঠিখেলার বেশ কদর ছিলো। কিন্তু এখন মোবাইল ফোন আর কম্পিউটারের যুগে এসব মূল্যহীন। লাঠিয়াল দলের সর্দার আব্দুল আজিজ (৭০) উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের চৌরঙ্গী ভালুকা এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, ৫০ বছর ধরে লাঠিখেলা করছি। একসময় শতাধিক সদস্য থাকলেও বর্তমান ৩০ জনের দল। এতোবছরেও সরকারি- বেসরকারিভাবে কোনোকিছু পায়নি। খেলার কদর থাকলেও খেলোয়ারদের মূল্যায়ন নেই।
তাই নতুন করে কেউ এখেলায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখানে নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানমালায় উদ্বোধক ছিলেন কুষ্টিয়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ। তিনি বলেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলা ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পহেলা বৈশাখে এমন বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়েছে। আলাউদ্দিন আহমেদের মত মানুষের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সমাজে আবারও ফিরতে পারে ঐতিহ্য।
