কুমারখালীতে অদৃশ্য অগ্নিকান্ডে ভস্মীভূত ৩ দোকান - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীতে অদৃশ্য অগ্নিকান্ডে ভস্মীভূত ৩ দোকান

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥  ভাই আমার চলার মতো কোনো পরিবেশ নাই। জায়গা নাই, জমি নাই, অর্থকড়ি কিছুই নেই। আজ ২০টা বছর ধরে যা কিছু গড়েছি সব শেষ। তিলেতিলে ২০ বছরে গড়া সম্পদ এক ঘণ্টার আগুনে পুড়ে শেষ। আমার লাইফটা (জীবন) মনে করেন এখানেই শেষ। আমার বলতে আর কিছুই নেই। আমার বাপেরও জাগা নাই। আমারও জাগা নাই যে তা দিয়ে চলব। গতকাল রোববার (২২ ফেব্রুয়ারী) বিকেলে অশ্রুসিক্ত নয়নে কাঁদতে কাঁদতে কথা গুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর জাকির হোসেন (৪০)। তিনি উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের লাহিনীপাড়া এলাকার আব্দুল খালেকের ছেলে। তিনি কাঠমিস্ত্রি ও ফার্নিচার ব্যবসায়ী। লাহিনীপাড়া মোড়ে অবস্থিত বাজারে তাঁর শোরুম ও কারখানা রয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ৩ টা ২০ মিনিটের দিকে তাঁর শোরুম ও কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

এতে তাঁর প্রতিষ্ঠানে থাকা বিপুল পরিমাণ কাঠ, কাঠের তৈরি বিভিন্ন প্রকারের আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। জাকির হোসেনের ভাষ্য, সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসেছিল। আগুনে তাঁর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে কিভাবে বা কোথা থেকে আগুনের সুত্রপাত ঘটেছে তা জানা যায়নি। শুধু জাকির নয়, ওই রাতের অগ্নিকাণ্ডে কারখানার পাশে অবস্থিত ফয়সাল শেখের কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তিনি ওই এলাকার ফজলু শেখের ছেলে। এছাড়াও আলতাফ হোসেনের ছেলে শরিফ উদ্দিনের দাঁতব্য চিকিৎসালয় পুড়ে গেছে।

এলাকাবাসী সুত্রে জানা যায়, রাত সাড়ে তিনটার লাহিনীপাড়া এলাকার তিনটি দোকানে দাউ দাউ করে আগুন দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে চিৎকার চেঁচাচেচি করে সকলে ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে এবং কুমারখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে মুঠোফোনে কল দেওয়া হয়। খবর পেয়ে রাত পৌণে ৪টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিভানোর কাজ শুরু করেন। এরপর এলাবাবাসী ও ফায়ার সার্ভিসের প্রায় একঘণ্টা চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে সকল মালামালসহ তিনটি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, লাহিনীপাড়া মোড়ে ছোট্ট একটি বাজার। বাজারের সড়কের ধারে জাকির হোসেনের ফার্নিচারের শোরুম এবং তার পিছনে ফার্নিচার তৈরির কারখানা ও গুদামঘর। সড়ক ঘেঁষে শোরুমের পাশেই অবস্থিত ফয়সালের কম্পিউটার ও শরিফের দাঁতব্য চিকিৎসালয়।

সেখানকার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কাঠের আসবাবপত্র, কম্পিউটার, ফটোকপি মেশিনসহ অন্যান্য সামগ্রী। ভিড় করেছে উৎসুক জনতা। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা রাশিদুল ইসলাম বলেন, গভীর রাতে জানালা দিয়ে আগুনের শিখা দেখতে পেয়ে চিৎকার চেঁচাচেচি শুরু করি। কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন সব ছুটে এসে পানি ও বালু দিয়ে আগুন নিভানোর চেষ্টা করে। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। ততক্ষণে কম্পিউটার, টিভি, কাঠের খাট, পালঙ্ক সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্থ ফয়সাল শেখ বলেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে দোকান বন্ধ করে বাড়ি যায়। আর সাড়ে ৩টার দিকে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ছুটে এসে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। খবর দেওয়ার অনেক পরে আসল ফায়ার সার্ভিস। আগুনে কম্পিউটার, ফটোকপি মেশিন, টিভি, লন্ড্রি মেশিন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

তাঁর ভাষ্য, আগুনে তাঁর প্রায় ৫ – ৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। সরকারিভাবে সহায়তা ছাড়া আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। কাঠের কারখানায় আগুনের খবর শুনে ছুটে এসেছেন লাহিনীপাড়া মীর মশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, জাকিরের কাছে প্রায় তিন লাখ টাকার আসবাব তৈরির কাজ চলছিল। কিন্তু আগুনে সব পুড়ে গেছে। অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। কি করব বুঝতে পারছি না। খবর দেওয়ার পরও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দেরিতে আসায় সব পুড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন ক্ষতিগ্রস্থ জাকিরের ভাই লালন হোসেন। তিনি বলেন, ভাইয়ের আর কোনো সম্পদ অবশিষ্ট নেই। আগুনে সব শেষ। সমাজের বিত্তবান, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে সহযোগীতার প্রত্যাশা তাঁর।

অভিযোগ অস্বীকার করে কুমারখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের লিডার আলী হোসেন ফোনে বলেন, রাত ৩ টা ৪৫ মিনিটের দিকে খবর পেয়ে মাত্র আট মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌছানো হয়। এরপর সকলের সহযোগীতায় ৪টা ৩৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসলেও প্রায় সবকিছু পুড়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতি ও আগুনের সুত্রপাত তদন্ত শেষে পরে জানানো যাবে। অগ্নিকাণ্ডে ঘটনায় অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, লিখিত আবেদন করা হলে সরকারিভাবে নিয়ম অনুযায়ী সহযোগীতা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।