অটোরাইস মিলের দাপটে টিকতে না পেরে কুমারখালীতে হাস্কিং মিল (চালকল) বন্ধ হয়ে গেছে। টানা লোকসানের কারণে অনেক মালিক মিল বন্ধ করে দিয়েছেন মালিক পক্ষ। আবার অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে চাতাল কল ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। জীবিকার তাগিদে পেশাও বদল করেছেন সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা।

খাদ্য গুদামে সরকারের বেঁধে দেওয়া চালের দামের সাথে খোলা বাজারে দামে সমন্বয় না থাকা, অটো চালকলের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা, বিদ্যুতের ডিমান্ড চার্জ, শ্রমিক সংকটসহ নানাবিধ কারণে উপজেলায় বন্ধ হচ্ছে চালকল গুলো। অনেক চালকল মালিক মূলধন হারিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন, আবার অনেকে টিকতে না পেরে ভাড়া দিয়েছেন কল। কেউ কেউ আবার চাতালগুলোতে চালের পরিবর্তে ধানের চিটা থেকে গুড়া তৈরি করছেন বলে জানিয়েছেন মালিকরা। তাঁদের দাবি, ওই সব সমস্যার সমাধান করা না গেলে হারিয়ে যাবে ঐতিহ্যবাহী চালকল। আর শ্রমিকরা জানান, প্রতিটি চালকলে চার থেকে পাঁচজন করে শ্রমিক কাজ করেন। প্রতি ১০০ মন ধান শুকিয়ে চাল তৈরি করতে তিন থেকে সাত দিন সময় লাগে। এতে তাঁরা মজুরি দুই হাজার ৫০০ টাকা। আর চাল পান ১৮ কেজি। এগুলো সবাই ভাগযোগ করে নিয়ে কোনমতে দুঃখ কষ্টে চলছে তাঁদের জীবন। তাঁদের অভিযোগ, গত ২৫ বছরে মজুরি বাড়েছে মাত্র ১০০ টাকা। আর চাল বাড়ানো হয়েছে মাত্র দুই কেজি। সেজন্য জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে পেশা বদলিয়েছে অনেকে। উপজেলা খাদ্য গুদাম কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, শস্যভান্ডার খ্যাত কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় এক সময় ছোট-বড় প্রায় ৫৩ টি চালকল গুলো বা হাসকিং মিল ছিল। বর্তমানে খাদ্যগুদামের নিবন্ধনকৃত ২৮ টি চালকল রয়েছে। তার মধ্যে গত অর্থবছরে চুক্তি অনুযায়ী চাল দিতে না পারায় ২২ টি কলের নিবন্ধন বাতিল করেছে সরকার। বর্তমানে এসব হাসকিং মিলের পাশাপাশি উপজেলায় ১টি অটো রাইস মিল আছে। চালকলের মালিক শাহীন আলম বলেন, ‘আমি দুই বছর ধরে শুধু সরকারি বরাদ্দের চাল উৎপাদনের জন্য বছরে মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন মিল চালু করি। এ ছাড়া সারা বছরই মিল বন্ধ থাকে। আমার মতো সিংহভাগ হাস্কিং মিলের একই অবস্থা।’ মেসার্স ভাইভাই চালকলের মালিক হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘ধান কিনে চাল উৎপাদন করতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লেগে যায়। আর অটোরাইস মিলে এক-দুদিনের মধ্যে চাল উৎপাদন করে বাজারজাত করে এবং তাঁরা দাম পায়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না।’ উপজেলা খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা মোঃ এরশাদ আলী বলেন , খোলা বাজারের সাথে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে সমন্বয়হীনতার কারনে মিল মালিকরা চাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর অটো মিলের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে চালকল গুলো সেই কারণে বন্ধ হয়েছে। গত অর্থবছরে উপজেলায় ২৭ হাজার ৮৫৩ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন কৃষকরা। আর উৎপাদিত ধান থেকে এক লাখ ১ হাজার ৩১১ মেট্রিকটন চাল উৎপাদন করা হয়। চালকল চালু থাকলে লাভবান হবেন কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ নানান পেশায় মানুষ। সেজন্য গ্রামবাংলার ঐহিহ্যবাহী চালকল বাঁচাতে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
