কুকুরের ক্ষুধার তাড়নায় কুষ্টিয়ায় ৩৫ জনকে কামড় - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুকুরের ক্ষুধার তাড়নায় কুষ্টিয়ায় ৩৫ জনকে কামড়

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাসহ কয়েকটি উপজেলায় কুকুরের দৌরাত্ম্যে পুরো উপজেলা জুড়ে এখন তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে। গত রবিবার সারাদিনে কুকুরের কামড়ে আহত ৩৫ জন ভুক্তভোগী ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে শিশু, কিশোর, নারী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় অথবা মার্কেট এলাকায় হামলার শিকার হয়েছেন। সরেজমিনে ভেড়ামারা সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি গার্লস স্কুল, মধ্যবাজার, রেলবাজার, পৌরসভা-হাসপাতাল সড়ক ও পৌরবাজার এলাকায় দেখা যায়, দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ঝাঁক কুকুরের দল।

পথচারীরা জানান, দিন দিন কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু তাদের খাদ্য না থাকায় দিন দিন ক্ষেপে যাচ্ছে। আগের দিনের মানুষগুলো কুকুরকে ভালোবাসতো, নিজ বাড়ি থেকে খাবার দিত। তা খেয়ে বাড়ি পাহারা দেওয়ার কাজ করত। কিন্তু এখন গ্রামে বা শহরে জমিতে উঠেছে নতুন নতুন ভবন; একপর্যায়ে তাদের থাকার জায়গাটুকুও দখল হয়ে যাচ্ছে। খেতে পাচ্ছে না খাবার, দিন দিন হিংস্র রূপ ধারণ করছে। এতে করে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা সবসময়ই এক ধরনের অজানা আতঙ্কে থাকছেন। মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘ছলেকে স্কুলে পাঠাতে পারছি না নিশ্চিন্ত মনে। রাস্তায় এত কুকুর যে, কখন যে কামড়ে দেয় এই ভয়ে থাকি।

একদিন তো অন্য বাড়িতে গিয়ে ফোন করার পরে ছেলেকে নিয়ে আসতে হয়েছে। এখন কুকুরের আতঙ্কে জীবনযাপন করছি।

শিক্ষক ইলিয়াস হোসেন বলেন, “প্রায়ই আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর কুকুরের আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ হালকা আহত হচ্ছে, কেউ গুরুতরও হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অভিভাবকরা বলেন, সন্তান স্কুলে গেলেই টেনশনে থাকতে হয়। কখন কী হয়, এই অজানা শঙ্কা মাথায় ঘুরতে থাকে। এতে আমাদের মানসিক ভোগান্তিও দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব চললেও তা নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দিনের বেলায় যেমন, রাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

দোকান বন্ধের পর ফাঁকা রাস্তায় ফেরার পথে কুকুরের ধাওয়া খাওয়া এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা। অনেকেই নিরাপত্তাহীনতার কারণে সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ভেড়ামারা সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী আয়ান বলেন, “প্রায়ই দেখি ১০-১২টি কুকুর একসঙ্গে হাঁটে। হুট করে ঘেউ ঘেউ করলে বা দৌড় দিলে খুব ভয় লাগে। অনেক সময় রাস্তা বদলে অন্য দিক দিয়ে যেতে হয়।”

অভিভাবক জিনাত ফাতেমা বলেন, “ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে পারছি না নিশ্চিন্ত মনে। রাস্তায় এত কুকুর যে, কখন যে কামড়ে দেয় এই ভয়ে থাকি। একদিন তো অন্য বাড়িতে গিয়ে ফোন করার পরে ছেলেকে নিয়ে আসতে হয়েছে। সত্যি এখন কুকুরের আতঙ্কে জীবনযাপন করছি।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ বাঁচাতে অবশ্যই কুকুরের প্রয়োজন আছে। তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসার দরকার। প্রয়োজনে তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা বিশেষ প্রয়োজন।

বিদেশিরা কুকুরকে ভালোবাসে, এমনকি বাড়িতে রেখে একসঙ্গে খাবার খান। আর আমাদের দেশে কুকুরকে মারার জন্য কিছু ব্যক্তি মরিয়া হয়ে উঠেছে। কোনো প্রাণীকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা ঠিক হবে না। তবে নিতে হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। কুকুরের নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যেখানে টিকাদান, নির্বীজন কর্মসূচি ও জনসচেতনতা পাশাপাশি চলা জরুরি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভেড়ামারা পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনকে অবিলম্বে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, আক্রান্তদের চিকিৎসা সহায়তা এবং স্কুল-কলেজ এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোকে নিরাপদ রাখতে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি বা ভয়াবহ জলাতঙ্ক সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মিজানুর রহমান, ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোমবার পর্ষন্ত ২৭ জন চিকিৎসা নিয়েছে। হাসপাতালে প্রতিরোধক ভ্যাকসিন নেই । ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, পৌরসভা থেকে শিগগিরই বেওয়ারিশ কুকুরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পৌরসভাকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।