কুমারখালী ( কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি : সকাল থেকে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি ছিল। এমন বৈরী আবহাওয়ায় ঈদের নামাজ মসজিদে হবে, নাকি ঈদগাহ মাঠে? এ নিয়ে স্থানীয় দু’পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। এ নিয়ে গ্রামের অন্তত চার ভাগের তিন ভাগ মানুষই ঈদের নামাজ পড়তে পাড়েননি। এছাড়াও এ ঘটনায় বেশ কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের চর এলঙ্গী আচার্য্য গ্রামে শনিবার (২১ মার্চ) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘটে এমন চাঞ্চলকর ঘটনা।
আহতরা হলেন – ওই গ্রামের রবিউলের ছেলে রুবেল হোসেন (৩০), মুনার ছেলে গফুর (৪০) ও আলম ( ৪৫), শফিকের ছেলে শাকিল (২৫), আলমের ছেলে রিপন (২৬), আইয়ুবের ছেলে সরোয়ার (৪৫), সরোয়ারের ছেলে আশরাফুল (৩৫), ওসমানের ছেলে শাহিন ( ৩৫), মজিবরের ছেলে জিয়া (৩৭), লবু প্রামাণিকের ছেলে মুসা (৪৫) ও মন্টু ( ৫৫), মন্টু প্রামাণিকের ছেলে জুয়েল (২৭) ও হিরু প্রামাণিকের স্ত্রী ফিরোজা খাতুন (৩৩)। তারা কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে নিজ বাড়িতে রয়েছেন।
পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গড়াই নদীর চরে অবস্থিত চর এলঙ্গী আচার্য্য গ্রাম। সেখানে অন্তত ১২০ টি পরিবারে পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস। তাঁদের ইবাদতের জন্য একটি জামে মসজিদ ও একটি ঈদগাহ মাঠ রয়েছে। শনিবার পবিত্র ঈদ উল ফিতরের দিন ছিল। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সকাল থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। সেজন্য ঈদগাহ কমিটি সকাল সাড়ে ৮টার পরিবর্তে ঈদের জামাত সাড়ে ৯টায় নির্ধারন করেন।
এনিয়ে গ্রামবাসী দুই ভাগে বিভিক্ত হয়ে যান। এবং মন্টু প্রামাণিকের নেতৃত্বে চর এলঙ্গী আচার্য্য জামে মসজিদে গ্রামের একাংশের মানুষ নামাজ শুরু করে দেন। এরপর ঈদগাহ কমিটির পক্ষ্য থেকে আলম, গফুর, শাকিলসহ কয়েকজন প্রতিপক্ষের লোকদের ঈদগাহে আসার আহবানে যান। এ সময় তাঁদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার জেরে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১৩ জন আহত হয়ে হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাধী নেন।
এছাড়াও এ ঘটনায় মন্টু প্রামাণিকের পক্ষের বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় গ্রামের অন্তত চার ভাগের তিন ভাগ মানুষ এবার ঈদে নামাজ পড়তে পাড়েনি বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
ওইদিন দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, কমপ্লেক্সের বারান্দায় আহত রুবেল, জুয়েল, মন্টু প্রামাণিক ও ফিরোজা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের হাতে, মুখে, মাথায় আঘাতের ক্ষত।
এ সময় আহত রুবেল বলেন, সকালে বৃষ্টি হচ্ছিল। এক পক্ষ বলে মসজিদে নামাজ হবে। আরেকপক্ষ বলে ঈদগাহ মাঠে। এ নিয়ে তর্কাতর্কি করতে করতে মারামারি শুরু হয়ে যায়। মারামারি ঠেকাতে গেলে তাকে জুয়েল, মন্টু, মুসাসহ ১০ – ১২ বাটাম ও বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করে মাথা ফাঁটিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসক তাঁর মাথায় ৮টি সেলাই দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁদের পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়ে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাধীন। তাঁদের লোকজন ঈদের নামাজ পড়তে পারেননি।
অভিযোগ অস্বীকার করে আহত জুয়েল বলেন, বৃষ্টির কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ শেষে খুতবা চলছিল। এ সময় আলম, শহিদসহ অনেক মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে অতর্কিত হামলা করে। এতে তিনি, তাঁর বাবা, চাচাতো ভাবিসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এছাড়াও তাঁদের পক্ষের কিছু বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ তোলেন তিনি।
বিকেলে চর এলঙ্গী আচার্য্য গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। আহত মন্টু প্রামাণিক, জুয়েলসহ বেশ কিছু বাড়িতে ভাঙচুরের ক্ষত।এ সময় জুয়েলের ভাবি রোকেয়া খাতুন বলেন,’ ঈদের নামাজ পড়া নিয়ে রাস্তায় মারামারি হয়েছিল। আর ওরা এসে আমারে বাড়িতে ভাঙচুর করে লুট করে নিয়ে গেছে।
রহমানের মা ছারা খাতুন বলেন, ‘ এরশেদ, আলম, সাইফুল এসে আমার ছেলের অটোগাড়ি ও বাড়ি ভেঙে চুরমার করে দিছে। আমরা এর বিচার চাই।’
গ্রামবাসীর সংঘর্ষের কারণে এবার ঈদ উল ফিতরের নামাজ পড়তে পাড়েননি স্কুল শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি উপজেলার এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, সকালে বৈরী আবহাওয়া ছিল। ঈদের নামাজ মসজিদে হবে, নাকি ঈদগাহে হবে। এনিয়ে নিজেরা নিজেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের কারণে আর নামাজ অনুষ্ঠিত হয়নি। এবার নামাজও পড়া হয়নি।
চর এলঙ্গী আচার্য্য ঈদগাহ ময়দানের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, প্রায় ৫০০ জন মানুষের বসবাস গ্রামটিতে। বৃষ্টির কারণে সাড়ে ৮টার নামাজ সাড়ে ৯টায় নির্ধারন করা হয়। কিন্তু একটি পক্ষ মসজিদে নামাজ শুরু করলে দু’পক্ষের সংঘর্ষ হয়। একারণে অন্তত ৪৫০ জন মানুষ এবার নামাজ পড়তে পাড়েনি। সংঘর্ষ আর হামলার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ঈদের নামাজ মসজিদে হবে, নাকি ঈদগাহে। এ নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনও কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। তবে নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে কি না? এ তথ্য তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি ওসি।
