ইসলামিক স্কলারের কেউ ইবির উপাচার্য হয়ে আসুক - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ইসলামিক স্কলারের কেউ ইবির উপাচার্য হয়ে আসুক 

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৪

ইবি প্রতিনিধি ॥ তিন সপ্তাহের অধিক সময় ধরে অভিভাবকশূন্য অবস্থায় রয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর পদত্যাগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। পরে একে একে উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষসহ প্রশাসনের শীর্ষ ১০ কর্তাব্যক্তিও পদত্যাগ করেন। এ অবস্থায় শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগ পেতে বিভিন্ন মহলে তদবির শুরু করেছেন প্রার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল, ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় করে দেশের উচ্চশিক্ষায় ভূমিকা রেখে উন্নত জাতি গঠন করা। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য থেকে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেকটাই দূরে।

রাজনীতির রোষানলে পড়ে বারংবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। আর তাই নতুন উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কেমন উপাচার্য চায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা? তা নিয়ে বিভিন্ন অনুষদের আটজন শিক্ষার্থী এবং চারজন শিক্ষকের মতামত তুলে ধরা হলো। ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদভুক্ত ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম রাব্বানী বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলো কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় করে পাঠদানের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। তবে ইসলামী শিক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বনামধন্য ইসলামী স্কলার ভাইস চ্যান্সেলর প্রয়োজন যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ঘটেনি।

এখন দেশ একটা সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভাবছে একজন ইসলামি স্কলার ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পেলে এদেশের প্রথম স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট হবে। পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার আদলে হোক এমনই প্রত্যাশা। কলা অনুষদভুক্ত আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মুহিববুল্লাহ নোমান বলেন, কালের বিবর্তনে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজের প্রতিষ্ঠালক্ষ্য থেকে যোজন যোজন দূরে সরে এসেছে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে  বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এমন একজন ইসলামিক স্কলারকে উপাচার্য হিসেবে প্রয়োজন, যিনি এটিকে পুনরায় তার প্রতিষ্ঠা লক্ষ্য অনুযায়ী পরিচালনা করবেন এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ধাবিত করবেন।

আইন অনুষদভুক্ত আল-ফিকহ্ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, উপাচার্য অবশ্যই এমন একজন হবেন যিনি দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার ঊর্ধ্বে থাকবেন। এককথায় নিরপেক্ষ থাকবেন। তার মাঝে অবশ্যই বৈষম্যবিরোধী চেতনা রক্ত-মাংসে লালন করতে হবে। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদভুক্ত আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থী তামান্না জাহান স্নেহা বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অন্তবর্তীকালীন সরকার বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর উপাচার্য নিয়োগের কাজ শুরু করেছেন। তাই দেশ সংস্কারের মতো এই সময়ে ইসলামি চেতনাসমৃদ্ধ এবং সুদক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার মোক্ষম সুযোগ বলে আমি মনে করি। যার হাত ধরে জ্ঞান ও গবেষণা নির্ভর পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ বিনির্মাণে কল্যাণমূখী ভুমিকা পালন করতে করতে পারবে।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ত্বকী ওয়াসীফ বলেন, পিতা যেমন একটা পরিবারের পরিচালক, তেমনি উপাচার্যও একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর উপাচার্য বৃন্দের কর্মকাণ্ড লক্ষ করলে যথেষ্ট অনিয়ম ও বিতর্ক ফুটে ওঠে। যেটা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করি। যৌক্তিক ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন এমন উপাচার্য প্রয়োজন যিনি তার নৈতিকতার ক্ষেত্রে কঠোর হবেন। আর পৃথিবীর সকল নৈতিকতার আঁতুরঘর হচ্ছে প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম। পৃথিবীতে যত ভাল কাজ রয়েছে, কোনোটাই ধর্ম বহির্ভুত নয়।

আর তাই আমরা এমন কাউকে উপাচার্য হিসেবে দেখতে চাই, যিনি হবেন ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ। কলা অনুষদভুক্ত ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রোকসানা খাতুন ইতি বলেন, এমন একজনকে উপাচার্য হিসেবে চাই যার একাডেমিক প্রোফাইল সমৃদ্ধ থাকবে এবং যিনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে অরাজনৈতিক ও গবেষণামূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবেন। সর্বপরি শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বদাই বাস্তবমুখী চিন্তা করবেন এবং একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে সব দূর্নীতি দূর করে ক্যাম্পাসকে শিক্ষার্থীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলবেন তেমন ব্যক্তিকেই অভিভাবক হিসেবে চাই। ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদভুক্ত ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সোহান বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে সর্বজন স্বীকৃত যোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হোক। কোনো লেজুড়বৃত্তি রাজনৈতিক প্রশাসন আমরা চাই না।

আমরা আগামীর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতিমুক্ত, র‌্যাগিং মুক্ত এবং মুক্ত চেতনার নিরাপদ ক্যাম্পাস হিসেবে দেখতে চাই। জীব বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী হাজেরা খাতুন বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। জেনারেল শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষার সমন্বয়ের আদলে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় জেনারেল শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষার আদলে বিশ্ববিদ্যালয়টি রূপ লাভ করেনি।

এর অন্যতম কারণ শুধু জেনারেল ক্যাটাগরি থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া। আমরা এমন একজনকে উপাচার্য হিসেবে চাই যিনি যতটা সম্ভব বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবেন। এদিকে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে চেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান অচলাবস্থা কাটাতে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের কাছে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষক সমিতি। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে শিক্ষক সমিতি জানায়, ভিসি, প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারার- এর পদত্যাগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ফলে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ অধ্যাপকদের মধ্য থেকে পদগুলোতে নিয়োগদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামান বলেন, যিনি হবেন শিক্ষার্থী বান্ধব, ছাত্র জনতার আবেগের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করবেন এবং যার সম্পর্কে পূর্বে কোনো নেতিবাচক রিপোর্ট পাওয়া যায় নি—তেমন একজন ব্যক্তিকেই আমরা উপাচার্য হিসেবে চাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া উচিত তা নিয়ে বেশকিছু ক্রায়টেরিয়া তুলে ধরেছেন লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স বিবেচনায় অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অধ্যাপকদের ভেতর থেকে উপাচার্য নিয়োগ দান এবং কমপক্ষে শিক্ষকতায় ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পাশাপাশি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিবেদিতপ্রাণ এবং ব্যক্তি জীবনে ইসলামী মূল্যবোধের অনুশীলনকারী হতে হবে। এ ছাড়া একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব দানে সক্ষম, পেশাদারীত্বের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে আগ্রহী, সকলকে সঠিক সময়ে তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে ইতিবাচক মানসিকতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলকে লক্ষ্য অর্জনে সকলকে একসূত্রে গাঁথার ক্ষমতা, ক্যাম্পাসে গ্রহণযোগ্যতা এবং সপরিবারে নির্ধারিত বাংলোতে বসবাস করবেন তেমন একজনকেই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের আহবান জানিয়েছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রভাষক ইয়ামিন মাসুম জানিয়েছেন, আমরা একজন শিক্ষানুরাগী, মহৎপ্রাণ, গবেষক এবং  সর্বোপরি শিক্ষক-শিক্ষার্থীবান্ধব অভিভাবক চাই। যিনি সুনিপুণতার সঙ্গে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পাদন করবেন। অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মিথিলা তানজিল জানান, আমরা একজন ভালো একাডেমিশিয়ান উপাচার্য চাই। যিনি শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতি কমানোর জন্য অবদান রাখবেন ও দলীয়করণ প্রমোট না করে একজন একাডেমিশিয়ান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরিবেশ সৃষ্টি করবেন।