ইবি শিক্ষিকা রুনার দাফন সম্পন্ন - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ইবি শিক্ষিকা রুনার দাফন সম্পন্ন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মার্চ ৬, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) নিজ বিভাগের অফিস কক্ষে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক লিখিত জবানবন্দি দিয়েছে অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমান। একই ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় অভিযোগ এজাহার দায়ের করেছেন নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান। এদিকে বৃহস্পতিবার বাদ যোহর জানাজা শেষে তাকে কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মচারীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. হোসেন ইমাম।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বুধবার রাতে পুলিশের উপস্থিতিতে ফজলুর রহমানের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বিভাগীয় প্রধান তাকে বদলি করায় এবং বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় তার মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন। ডা. হোসেন ইমাম বলেন, ফজলুর রহমান বর্তমানে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন এবং তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত।

ডাকলে তিনি সাড়া দিচ্ছেন এবং চোখ মেলে তাকাচ্ছেন। কিছু জানতে চাইলে কলম দিয়ে লিখে উত্তর দিতে পারছেন। বুধবার রাতেই পুলিশের কর্মকর্তারা তার দুই পাতার লিখিত বক্তব্য সংগ্রহ করেছেন। তিনি আরও জানান, ফজলুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে আসছেন এবং তাকে ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিকে বৃহস্পতিবার ভোরে নিহত শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনার স্বামী মো. ইমতিয়াজ সুলতান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় উপস্থিত হয়ে চারজনের নাম উল্লেখ করে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী অভিযুক্ত ফজলুর রহমান, সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং সহকারী অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুদ রানা জানান, নিহত আসমা সাদিয়া রুনার স্বামী চারজনের নাম উল্লেখ করে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, মামলা হয়েছে, আমি বা আমরা কলিগ, মামলা করেছে ম্যাডামের পরিবার। এখন তারা যদি আমার নাম ঢুকায় এখানে আমার তো কিছু বলার থাকে না। আমি তো এই বিভাগেরই শিক্ষক। যদি বিভাগের কোন অসন্তুষ্টির বিষয়ে তিনি বাসায় শেয়ার করে থাকেন তাহলে তিনি কি বলেছেন তা ম্যাডাম ই ভালো বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো এখন বেঁচে নেই। তিনি আরো বলেন, আমাকে ৪ নম্বর দিক আর ১ নম্বর সেটা বিষয় নয়, ম্যাডাম তো নাই আমাদের মাঝে এটাই সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়।

যে নৃশংস হত্যাকান্ড হয়েছে প্রকাশ্যে তার সঠিক ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক। যদি আমি জড়িত থাকি তাহলে আমারও বিচার হোক। এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নিহতের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয় বলে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের আরএমও ডা. হোসেন ইমাম ও মেডিকেল অফিসার ডা. রুমন রহমান। পরে বাদ জোহর কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও ইসলামি বক্তা আমির হামজা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. ইয়াকুব আলীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। নিহত আসমা সাদিয়া রুনা কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি তিন মেয়ে ও এক ছেলেসহ চার সন্তানের জননী।

ইমতিয়াজ-রুনা দম্পতির ঘরের চার সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানের বয়স ১১ বছর, দ্বিতীয় সন্তানের বয়স ৯ বছর, তৃতীয় সন্তানের বয়স দেড় বছর এবং তাদের সবচেয়ে ছোট বাচ্চার বয়স ৬ মাস। নিহতের সহকর্মী ও স্বজনরা এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ইফতারের আগে কেউ এভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে তা আমার জানা ছিল না, নিজের জীবন দিয়ে তা দেখতে হলো। তার কোনো ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমা করে দেবেন। তিনি বলেন, ১৩ সেপ্টেম্বর আমার চতুর্থ সন্তান জন্ম নেওয়ার পর আমি রুনাকে নিয়ে সনো হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। ১৯ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। একটা দিনের জন্যও তিনি তার দায়িত্ব থেকে অনুপস্থিত হয়নি।

এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে হত্যাকারী একা জড়িত নয়, সবাইকেই শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. নকীব নসরুল্লাহ বলেন, রুনা অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি। এরকম মর্মান্তিক ঘটনা জীবনে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখিনি। ইবি প্রশাসন, শিক্ষক-ছাত্রসমাজ শোকাভিভূত। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুসারে রুনার যত প্রাপ্য আছে, সব আমরা নিশ্চিত করব। রুনার চারটি সন্তান রয়েছে, পরিবারের পাশে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করবে।’ উল্লেখ্য, বুধবার (৪ মার্চ) বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে সমাজকল্যাণ বিভাগের নিজ কক্ষে বসে থাকা অবস্থায় তাকে ছুরিকাঘাত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমান। পরে তিনি নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।