ইবি প্রতিনিধি ॥ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। অভ্যুত্থানবিরোধীদের নানা কর্মকাণ্ডে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছিল অস্থিরতা। এরমধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর মৃত্যু ছিল বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। গত ১৭ জুলাই শাহ আজিজুর রহমান হলের সামনের পুকুর থেকে সাজিদের লাশ উদ্ধার হলে এ ঘটনার বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। ১৯ জুলাই সাজিদের মৃত্যুর তদন্ত ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে প্রশাসন ভবনের সামনে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা।
পরে ৩ আগস্ট প্রকাশিত ফরেনসিক রিপোর্টে শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি উল্লেখ থাকলে পরদিন ৪ আগস্ট সাজিদের বাবা ইবি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলে আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। এদিনই ঢাবি ও রাবির শিক্ষার্থীরাও বিচার দাবিতে ফুঁসে ওঠে। সর্বশেষ ঘটনার তদন্তভার গড়ায় সিআইডির উপর। এরপর বিভিন্ন সময় সাজিদ হত্যার বিচার দাবিতে দফায় দফায় ক্যাম্পাসে আন্দোলন হলেও সিআইডি এখনও পর্যন্ত কোনো অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারেনি। এরমধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিরোধিতাকারী ১৯ শিক্ষক ও ১১ কর্মকর্তাকে সাময়িক বহিষ্কার এবং ৩৩ শিক্ষার্থীর (ছাত্রলীগ) সনদ বাতিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গত ৩০ অক্টোবর ২৭১ তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া এ বছর বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা দিতে আসা ইবি শাখা ছাত্রলীগের অন্তত ৭ নেতাকর্মীকে ধরে থানায় সোপর্দ করে শিক্ষার্থীরা। এদিকে ডাকসু, জাকসু, রাকসু ও চাকসু নির্বাচন আলোচনায় আসলে শিক্ষার্থীরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ইকসু) গঠনের দাবি তোলে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২৭১ তম সিন্ডিকেট সভায় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের গঠনতন্ত্র পাস করে। সিন্ডিকেটে গৃহীত হওয়া গঠনতন্ত্র অনুমোদনের জন্য ইউজিসিতে পাঠানো হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে অর্ডিন্যান্স আকারে প্রকাশের পর ১৫ দিনের মধ্যে উপাচার্য ইকসু বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও সর্বশেষ সেই আশ্বাস হালে পানি পায়নি।
এদিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ, যৌন হয়রানি, সমকামিতাসহ নানা অভিযোগে ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হাফিজুল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করা হয়। যৌন হয়রানির অভিযোগে আরেক শিক্ষক আজিজুল ইসলামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। এছাড়া কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই এক বছরের বেশি বিভাগে অনুপস্থিত থাকায় আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. জহুরুল ইসলাম ও আইসিটি বিভাগের অধ্যাপক ড. বিকাশ চন্দ্র সিংহকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তবে ২২ বছরের চাকরিজীবনের প্রায় ১২ বছরই ছুটি কাটানো আরেক শিক্ষক শফিকুল আলমের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে অভিযুক্ত ওই শিক্ষক নিজের নামের বানান ভুল লিখে একটি পদত্যাগপত্র জমা দেন। এছাড়া ইবিতে মারাত্মক সেশনজটে থাকা বিভাগগুলোতে সেশনজট কিছুটা কমলেও মানসম্মত শিক্ষা ছাড়াই শিক্ষকরা কোনোমতে কোর্স কম্পিলিট করে সেমিস্টার শেষ করছেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
অন্তত ১৪টি বিভাগে চরম শিক্ষক সংকটে একাডেমিক কার্যক্রমের অবস্থা টালমাটাল থাকলেও বিগত এক বছরে মাত্র ৬ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের নামে থাকা ইবির সকল স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা হয়। এছাড়া ঈদের ছুটি শেষে নিজ বাড়ি থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা যান আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাশেদুল ইসলাম। ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী সুমাইয়া শারমিন শান্তা লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সর্বশেষ সাজিদ আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পাঁচ মাস পেরোলেও এ ঘটনার কোনো ধরনের সুরাহা না হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সাজিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।
