ঢাকা অফিস ॥ চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যাসহ সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার পুনঃতদন্ত চেয়ে করা জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আবেদন খারিজের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী মনসুরুল হক ইনু এই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন। তবে এদিন যুক্তিতর্ক শেষ না হওয়ায় তিনি সময়ের আবেদন জানান।
ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ৬ই এপ্রিল পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। এদিন ইনুর আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী।
তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার পুনঃতদন্ত চেয়েছেন। প্রসিকিউশনের আপত্তি ও উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আসামপক্ষের করা দুটি আবেদনকে ফ্রিভোলাস (অসার) এবং বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার কৌশল (ডিজাইন) হিসেবে মন্তব্য করে ট্রাইবুনাল যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) শুরুর আদেশ দেন। এদিন যুক্তিতর্ক শুরুর আগে আসামিপক্ষ পুনঃতদন্ত ও সাক্ষীদের পুনরায় তলব করার দুটি পৃথক আবেদন দাখিল করে।
এর বিরোধিতা করেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ক্রিমিনাল কেসে রি-ইনভেস্টিগেশন তো হয় না। আসামিপক্ষ এই মামলাকে নিউজ আইটেম (সংবাদের খোরাক) করার জন্য এই আবেদন করেছে। মামলাটি নিয়ে আসামিপক্ষ যেন এমন ‘নিউজ আইটেম’ করতে না পারে, সেজন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে রুল প্রার্থনা করেন চিফ প্রসিকিউটর।
শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল ‘মোবাশ্বের আলী বনাম রাষ্ট্র’ মামলার আইনি রেফারেন্স টেনে বলেন, রি-ইনভেস্টিগেশন বা পুনঃতদন্ত করা যায় না, তবে ফার্দার ইনভেস্টিগেশন বা অধিকতর তদন্ত হতে পারে। এরপর উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ট্রাইব্যুনাল আবেদন দুটি খারিজ করে দেন। আদালত মন্তব্য করেন, এটি ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার একটি ডিজাইন (কৌশল)।
মামলার পুনঃতদন্ত আবেদনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে, – জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর ঘটনাবলি থেকে উদ্ভূত মামলাসমূহের তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সদ্য সাবেক চীফ প্রসিকিউটর মোঃ তাজুল ইসলাম ও তার টিমে সদস্যদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ইতোপূর্বে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে জনাব ইনুকে নানাভাবে চাপ ও হুমকি প্রদর্শন করে সাবেক চীফ প্রসিকিউটর জনাব ইনুকে ট্রাইব্যুনালে বক্তব্য উপস্থাপনে বাধা প্রদান করেছেন যে কারণে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
যেমন-২০/০৭/২০২৫ তারিখে জনাব ইনু ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ করেছিলেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আদালতের কোন আদেশ ছাড়া এবং তার আইনজীবীকে অবহিত না করে কারাগারে প্রবেশ করে তার কন্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করেছে। তখন তৎকালীন চীফ প্রসিকিউটর জনাব ইনুর বক্তব্য উপস্থাপনের বিরোধিতা করে বাঁধা প্রদান করেছেন। পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনাল-২ এ চার্জ গঠনের সময়ও জনাব ইনুকে বক্তব্য প্রদানেও তিনি বাঁধা দিয়েছেন।
এরপর চার্জ আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ শুনানিকালে আসামীপক্ষের ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত বক্তব্যকে তৎকালীন চীফ প্রসিকিউটর রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে অবিহিত করেছেন যা তিনি কোনভাবেই বলতে পারেন না এবং তার এই ধরনের বক্তব্য আসামিপক্ষে স্বাধীনভাবে মামলা পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করেছে। একই কথা তিনি ট্রাইব্যুনালের বাইরে এসে মিডিয়ার সামনেও বলেছেন যা জনগণকে শুধু বিভ্রান্তই করেনি, বরং এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জনাব ইনুর রাজনৈতিক বিরুদ্ধ মতের লোকদের তার ও তার আইনজীবীদের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
এছাড়া জনাব ইনুর বিরুদ্ধে আনীত মামলায় তৎকালীন চীফ প্রসিকিউটরের স্বার্থের সংঘাত (পড়হভষরপঃ ড়ভ রহঃবৎবংঃ) ছিল। কারণ প্রথমত: তিনি জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালে প্রকাশ্যে কথিত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন যার পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে। তার এই ধরনের কর্মকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে প্রসিকিউটরিয়াল অসদাচরণের যেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ফিলিপাইনের দুতার্তের মামলায় প্রসিকিউটর করিম খানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সমতুল্য।
উক্ত মামলায় আইসিসি করিম খানকে মামলা পরিচালনা থেকে বারিত করেছেন। দ্বিতীয়তঃ জনাব ইনুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী ও এবি পার্টির সাথে জনাব তাজুল ইসলামের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে তিনি কখনোই নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেননি, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে জনাব ইনুর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে মামলা আনায় করছেন। সার্বিক বিবেচনায় ন্যায় বিচারের স্বার্থে এই মামলার পুনঃতদন্ত প্রয়োজন।
এদিকে, আবেদনটি খারিজ করে দেয়ার পরে, ইনুর পক্ষে আরেকটি দরখাস্ত দাখিল করে প্রসিকিউশন পক্ষের ২ নং স্বাক্ষী জনাব তানভির হাসান জোহা ও ১০ নং সাক্ষী তদন্তকারী কর্মকর্তাকে পুনঃজেরা করার জন্য রিকলের আবেদন করা হয়েছিল। এতে বলা হয়, প্রসিকিউশন ও তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি প্রকাশিত দুর্নীতির অভিযোগের কারণে ন্যায় বিচারের স্বার্থে এই দুজনকে পুনঃজেরা করা প্রয়োজন। এই দুর্নীতির বিষয়ে নব নিযুক্ত চীফ প্রসিকিউটররের গৃহীত তদন্তের উদ্যোগও আসামী পক্ষের এই আবেদনের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।
কিন্তুট্রাইব্যুনাল এই আবেদনটিও খারিজ করে দিয়েছেন। এর আগে, ১০ই মার্চ সাফাই সাক্ষ্য হিসেবে প্রায় ৬৪ পৃষ্ঠার একটি লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেন হাসানুল হক ইনু। নিজের আইনজীবীর মাধ্যমে এ বক্তব্য দাখিল করেন তিনি। তবে মৌখিক সাক্ষ্যের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছিলেন এই আইনজীবী।
