মিজানুর রহমান নয়ন ॥ কুষ্টিয়ার প্রথম শ্রেণির কুমারখালী পৌরসভায় ১৫৩ বছরেও নির্মাণ হয়নি পরিকল্পিত ও আধুনিক ড্রেনেজ খাল বা নালা। অপরিকল্পিত যতটুকু নালা ছিল, তাও সংস্কার হয়না এক যুগ ধরে। ফলে দখল, দূষণ আর নানা স্থাপনায় তা হারিয়েছে। এতে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে হাসপাতাল, উপজেলা পরিষদ চত্বর, স্কুল, কলেজ, সড়ক, বাড়িঘরসহ পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী, স্বজন, চিকিৎসকসহ নানান শ্রেণি পেশার মানুষ। অপরদিকে ড্রেনেজ খাল সংস্কার না করে পানি নিষ্কাসনেরর জন্য কয়েকটি স্থানে ইঞ্জিনচালিত শ্যালো মেশিন বসিয়েছে পৌরকর্তৃপক্ষ। মেশিন দিয়ে জমে থাকা পানি সেচে গড়াই নদীতে ফেলা হচ্ছে। যদিও পৌরসভার এমন উদ্যোগকে হাস্যকর বলছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য পরিকল্পিত ও আধুনিক খাল বা নালা নির্মাণের দাবি জানান। গতকাল মঙ্গলবার (২৭ আগষ্ট) সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ চত্বর,পরিষদ মাঠ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকশত বাড়িঘর প্লাবিত।
পানি মাড়িয়ে চলাচল করছেন রোগী, স্বজনসহ নানা পেশার মানুষ। পৌরসভার পায়রা মোড় এলাকায় শ্যালো ইঞ্জিন চালিত মেশিন দিয়ে পানি সেচে ড্রেনেজ খালে গড়ানো হচ্ছে। এসময় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা সোনালী খাতুন বলেন, হাসপাতালের চারিদিকে হাটু সমান পানি। পুরুষেরা কাপড় উচু করে চলাচল করছে। কিন্তু আমরা তো তা পারছিনা। পানির কারণে মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে। ভ্যানচালক ওয়াসিম বলেন, পানি বেরুনোর রাস্তা নেই।
বৃষ্টি হলে জমে থাকে পানি। রোগী ও মানুষের চলাচলে নানান ভোগান্তি হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মু. আহসানুল মিজান রুমী জানান, পৌরসভার পরিকল্পিত ড্রেনেজ খাল না থাকায় হাসপাতালের জরুরি ও বহির্বিভাগের সামনে এবং কোয়াটার ভবনের চারিদিকে থৈথৈ পানি জমে আছে। এতে সকলেই চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পৌর কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, গড়াই নদীর কুলঘেঁষে ১৮৬৯ সালে নির্মিত কুমারখালী পৌরসভায় ৯ টি ওয়ার্ডে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস।
প্রায় এক যুগ আগে পৌরসভার পূর্বাঞ্চলীয় পানি অপরিকল্পিত ইটের তৈরি সরু ড্রেনেজে মাছবাজার, ফুলতলা রেলসেতু, কলেজমোড়, বাটিকামারা সেতু হয়ে গড়েরমাঠ সেতু দিয়ে বিভিন্ন বিল ও পদ্মা নদীতে চলে যেত। আর পশ্চিমাঞ্চলীয় পানি কাজিপাড়া, মাতৃসদন হাসপাতাল হয়ে কুণ্ডুপাড়া এলাকা দিয়ে গড়াই নদীতে পতিত হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন ড্রেনেজ খাল সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় তা দখলে, দূষণে ও স্থাপনায় হারিয়ে গেছে। এতে প্রতি বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
আরো জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরোসনে গড়ে প্রতি ওয়ার্ডে তিন কিলোমিটার করে মোট প্রায় ২৭ কিলোমিটার নালার প্রয়োজন। তার মধ্যে পূর্বে অপরিকল্পিত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার খাল আছে। তবে সরকারিভাবে বড় কোনো বরাদ্দ না পাওয়ায় এতোদিনেও নালা নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৩ সালে আই ইউ জি আই পি নামের একটি বরাদ্দে দেড় কিলোমিটার আধুনিক নালা নির্মাণের কাজ চলছে। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বয়োজ্যেষ্ঠ মতিয়ার রহমান বলেন, ১০ থেকে ১২ বছর আগে এই অঞ্চলের পানি ফুলকলা রেল সেতু, কলেজমোড়, বাটিকামারা সেতু হয়ে গড়েরমাঠ বিল দিয়ে পদ্মায় চলে যেত। তবে এখন খাল বন্ধ করে মানুষ বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
সেজন্য পানি আর বের হতে পারেনা। একই এলাকার শরিফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খাল সংস্কার না হওয়ায় মানুষের ঘরবাড়ি – পথেঘাটে পানি জমে থাকে। মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত তিনি খাল নির্মাণের দাবি জানান। কুমারখালী দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার বাসিন্দা হাবীব চৌহান জানান, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি জমে আছে। আর ড্রেন নির্মাণ না করে পৌরকর্তৃপক্ষ মেশিন দিয়ে পানি সেচতেছে। এটা জনগণের কাছে হাস্যকর। কুমারখালী পৌরসভার সার্ভেয়ার ফিরোজুল ইসলাম জানান, পানি নিষ্কাশনের জন্য তিনটি মেশিন সেট করে সেচে তা গড়াই নদীতে ফেলা হচ্ছে।
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. আকরামুজ্জামান জানান, দখল, দূষণে ও নানান স্থাপনায় আগের খালটি মৃত প্রায়। আবার ১৫৩ বছরেও বড় কোনো বরাদ্দ না পাওয়ায় ড্রেনেজ খাল নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। এতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তিনি আরো জানান, জলাবদ্ধতা নিরোসনে পৌরসভার ৯ টি ওয়ার্ডে প্রায় ২৭ কিলোমিটার খালের প্রয়োজন। সম্প্রতি একটি বড় প্রকল্প পাশ হয়েছে। সেখানকার অর্থায়নে প্রায় দেড় কিলোমিটার খাল নির্মাণের কাজ চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলাম জানান, পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
