মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ সাড়ে ১১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ ছিল। ফলন মাশাল্লাহ ৭০ – ৮০ মণ হয়েছে বিঘায়। জনের টাকার জন্য রবিবার চৌরঙ্গী হাটে ৯ মণ পেঁয়াজ নিছিলাম বেচতে। কিন্তু ৭০০ টাকা মণ দাম হওয়ার ফেরত এনেছি। অথচ এককেজি ভালো ইলিশের দাম ১৭শ থেকে দুই হাজার টাকা। এম্বা দাম হলে কৃষক বাঁচবে কিম্বা কন। রোববার দুপুরে আক্ষেপ করে কথা গুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কৃষক জহির হোসেন (৫৭)। তিনি উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর ভাষ্য, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ লেগেছে ৭০০ – ৮০০ টাকা।
বর্তমান পেঁয়াজের বাজার দরও একই। এতে লোকশানের শঙ্কা করছেন কৃষকরা। অন্তত এক হাজার ২০০ – ৫০০ টাকা দাম হলে লাভবান হবেন কৃষক। তাঁর স্ত্রী আবিরন নেছা বলেন, এবার জমিচাষ, সার, ঔষধ, পরিচর্যাসহ সবকিছুর খরচ বেশি লাগেছে। তবে খরচ বাড়লেও পেঁয়াজের ফলন গতবারের চেয়ে বেশি হওয়ায় খুব খুশি। কিন্তু দামে অখুশি। তিনি পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য চান। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। গেলবছর পেঁয়াজের ভালো দাম পাওয়ায় ২০২৫ – ২৬ অর্থবছরে চার হাজার ৯২৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছেন কৃষকরা। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২৮ হেক্ট জমি বেশি। আবহাওয়া ভালো থাকায় প্রতি হেক্টরে ২১ – ২২ টন হিসেবে মোট এক লাখ ৩ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। প্রতিমণ পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ লেগেছে ৭০০ – ৮০০ টাকা।
এ উপজেলায় পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১০ হাজার টন। রোববার (২৯ মার্চ) সকাল থেকে উপজেলার যদুবয়রা, পান্টি, চাঁদপুর, বাগুলাট ও চাপড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ও কৃষকের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, ৫ – ৭ জন দল বেঁধে জমি থেকে পেঁয়াজ টেনে তুলছেন। সেগুলো আবার কেউ বস্তা ভরে ও ভ্যান, অটো, ঘোড়ার গাড়িসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বাড়িতে নিচ্ছেন। আর দলবেঁধে মেয়েরা পেঁয়াজের গাছ কাটাকাটি করছেন ৪০ টাকা মণ চুক্তিতে। এ সময় যদুবয়রা ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের মৃত বিনোত আলীর ছেলে বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক বদর উদ্দিন ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, একটা লেবারের ( শ্রমিক) দাম ৭০০ টাকা।
আরো টানে নিয়ে যাতি হচ্ছে ভ্যান ভাড়া দিয়ে। এরপর ৭০০ টাকা করে ( মণ) পেঁয়াজ। এতে কি লাভ হয়? চাষিতো বাঁচতেইছে না। ১৫শ – দুই হাজার টাকা হলেও তো বাঁচা যেত। আরেক কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, বিঘায় জমিভাড়া, সার, ফাস, চাষ, জন দিয়ে ৫০ – থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ করে ৮০ মণ ফলন হয়েছে। ফলনে খুশি। কিন্তু দামে তো খুশি না। বাইরের আমদানি বন্ধ করে সরকারকে অবশ্যয় দাম বাড়ানো উচিৎ। চাপড়া ইউনিয়নের কিনাজ উদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৫)। তিনি পড়াশোনা শেষ করে আধুনিক কৃষিতে মনোনিবেশ করেছেন।
চলতি মৌসুমে প্রায় ৪৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, মাত্র ৩বিঘা জমির পেঁয়াজ তোলা হয়েছে। গড়ে ১০০ – ১২০ মণ ফলন হচ্ছে। তবে দাম না থাকায় পেঁয়াজ নিয়ে খুব চিন্তায় পড়েছি। তাঁর ভাষ্য, ভালো মানের আড়াই মণ পেঁয়াজের দামেও মিলছেনা এককেজি ইলিশ। এ সময় বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রাম মাঠের কৃষক আক্কাস আলী জানান, সাড়ে চার বিঘা জমিতে উচ্চফলনশীল লালতীর কিং জাতের পেঁয়াজের আবাদ করেছি। তিনি গত মৌসুমে প্রতিমণ পেঁয়াজ এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার টাকা বিক্রি করেছিলেন। আর শেষের দিকে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করে ভালো লাভ পেয়েছিলেন।
কিন্তু এবার পেঁয়াজ নিয়ে বিপাকে আছেন তিনিও। জানা গেছে, প্রতি রোববার পান্টি – যদুবয়রা সড়কের চৌরঙ্গী কলেজমাঠে বসে সপ্তাহিক পেঁয়াজের হাট। দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, হাটে বেচাবিক্রি শেষ। ব্যবসায়ীরা কেনা পেঁয়াজ নিজ গন্তব্যে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ সময় উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের মহননগর গ্রামের ব্যবসায়ী কুরবান আলী বলেন, ৮০ বস্তায় ১৬০ মণ মতো পেঁয়াজ কিনেছি। প্রতিমণ পেঁয়াজ মানভেদে ৬৫০ – ৮০০ টাকায় কেনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, বাজারে আমদানি বেশি হওয়ায় গতবারের তুলনায় দাম অর্ধেক।
হাট পরিচালনা কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, রোববার বাজারে প্রায় দুই হাজার মণ পেঁয়াজের আমদানি হয়েছিল। এবার উৎপাদন বেশি, বাজারে আমদানিও বেশি। এছাড়াও মুড়িকাটা পেঁয়াজ এখনও বাজারে আসছে। সেজন্য দাম খুবই কম। প্রয়োজন মেটাতে কৃষকরা লোকশানে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন।
কুমারখালী পৌর তহবাজারের মাছ বিক্রেতা সুকুমার সরকার বলেন, এককেজির ওজনের ইলিশ ২২শ টাকা। তিনটায় কেজির ইলিশ ১৫শ টাকা আর চারটায় কেজির মাছ এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিমণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৭০০ – ৮০০ টাকা বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম। তিনি বলেন, আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার ফলন বেশি হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ২১ – ২২ টন হিসেবে মোট এক লাখ ৩ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী কৃষকের লোকশান হচ্ছেনা। তবে লাভ কম হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার মনিটারিং করা হচ্ছে।
