আজ ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার গর্ব সাংবাদিকতার পথিকৃত কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের জন্মদিন - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

আজ ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার গর্ব সাংবাদিকতার পথিকৃত কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের জন্মদিন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুলাই ২০, ২০১৮
কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার

বাংলা সাংবাদিকতা, লোকসংস্কৃতি ও সমাজসংস্কারের ইতিহাসে যে ক’জন ব্যক্তিত্ব নির্ভীক কণ্ঠে গ্রামবাংলার কথা তুলে ধরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার (২০ জুলাই ১৮৩৩ – ১৮ এপ্রিল ১৮৯৬) একটি উজ্জ্বল নাম। কুষ্টিয়ার এই কৃতি সন্তান শুধু একজন সাংবাদিকই নন—তিনি ছিলেন কবি, সমাজসংস্কারক, সংগঠক এবং নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর। ঔপনিবেশিক শাসনের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তিনি গ্রামীণ জনজীবনের দুঃখ-দুর্দশা, নীলকরদের অত্যাচার, জমিদারি শোষণ এবং সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে তিনি তাই গ্রামকেন্দ্রিক সাংবাদিকতার পথিকৃত হিসেবে স্মরণীয়।

শৈশব, শিক্ষা ও জীবনের সূচনা

উনিশ শতকের মধ্যভাগে জন্ম নেওয়া কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বেড়ে উঠেছিলেন তৎকালীন নদীমাতৃক ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলে—আজকের কুষ্টিয়া। শৈশব থেকেই তিনি গ্রামীণ সমাজের নানা বৈষম্য প্রত্যক্ষ করেন। শিক্ষালাভের সুযোগ সীমিত হলেও আত্মশিক্ষা, পাঠাভ্যাস এবং সমাজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন সময়ের কঠিন প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্য। জীবনের নানা পর্যায়ে অর্থকষ্ট তাঁকে ঘিরে ধরলেও সেই দারিদ্র্যই তাঁকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে দেয়—যেখান থেকে জন্ম নেয় তাঁর কলমের সাহস।

‘কাঙ্গাল’ নামের তাৎপর্য

নিজেকে তিনি ‘কাঙ্গাল’ নামে পরিচিত করতে কুণ্ঠিত ছিলেন না। এই নামটি ছিল একধরনের সামাজিক প্রতিবাদ—ক্ষমতাবানদের আড়ম্বরের বিপরীতে দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতীক। তাঁর মতে, সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়; এটি ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার দায়বদ্ধতা। ‘কাঙ্গাল’ নামটি তাই ব্যক্তিগত নয়, বরং আদর্শিক পরিচয় হয়ে উঠেছিল।

গ্রামবাংলার কণ্ঠস্বর: গ্রামবার্তা প্রকাশিকা

কাঙ্গাল হরিনাথের সাংবাদিকতা-জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকার প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনা। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি গ্রামবাংলার জীবন, কৃষকের সমস্যা, শ্রমজীবী মানুষের দুঃখকথা এবং সামাজিক অন্যায়ের দলিল রচনা করেন। শহরমুখী সংবাদধারার বাইরে গিয়ে তিনি গ্রামকে সংবাদে কেন্দ্রে নিয়ে আসেন—যা তৎকালীন সাংবাদিকতায় ছিল যুগান্তকারী।

গ্রামবার্তা প্রকাশিকায় নীলচাষিদের নির্যাতন, জমিদারদের অত্যাচার, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হতো। ফলত, পত্রিকাটি দ্রুতই ক্ষমতাবানদের বিরাগভাজন হয়। হুমকি, আর্থিক চাপ ও সামাজিক বর্জন—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি কলম থামাননি। এই অদম্য দৃঢ়তাই তাঁকে সাংবাদিকতার ইতিহাসে অনন্য করেছে।

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার এর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার এর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা

নীলকর বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা

ঔপনিবেশিক বাংলায় নীলচাষ ছিল কৃষকের জন্য এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। ইউরোপীয় নীলকরদের জোরজবরদস্তি, ঋণের ফাঁদ ও শারীরিক নির্যাতনে কৃষকসমাজ বিপর্যস্ত ছিল। কাঙ্গাল হরিনাথ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন। তাঁর লেখায় নীলচাষের নির্মমতা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি উঠে এসেছে কৃষকের প্রতিরোধের গল্প। সাংবাদিকতার কলমকে তিনি আন্দোলনের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন—যা প্রশাসন ও জমিদারদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল।

সাহিত্য, কবিতা ও লোকসংস্কৃতির সাধক

কাঙ্গাল হরিনাথ কেবল সাংবাদিকই নন; তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যিক ও লোকসংস্কৃতির অনুরাগী। তাঁর কবিতা ও গদ্যে গ্রামীণ জীবনের সরলতা, বেদনা ও প্রতিবাদী সুর স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন—সাহিত্য ও সাংবাদিকতা আলাদা নয়; দুটোই সমাজের সত্যকে প্রকাশের মাধ্যম।

এই লোকসংস্কৃতির পরিসরে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বাউল-সাধক লালন ফকির-এর সঙ্গে। লালনের দর্শন—মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীনতা—কাঙ্গাল হরিনাথের চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ফলে তাঁর লেখায় ধর্ম, জাত ও শ্রেণিভেদের বিরুদ্ধে মানবিক আহ্বান লক্ষ করা যায়।

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার

সামাজিক সংস্কার ও নির্ভীকতা

কাঙ্গাল হরিনাথের সাংবাদিকতা ছিল স্পষ্টভাবে সামাজিক সংস্কারমুখী। তিনি নারী শিক্ষা, কুসংস্কার বিরোধিতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন। সমাজের রক্ষণশীল শক্তি তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও তিনি আপস করেননি। তাঁর নির্ভীকতা ছিল নীতিগত—ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতার বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সত্যের কঠিন পথ।

অর্থকষ্ট, নিঃসঙ্গতা ও অবিচল আদর্শ

জীবনের শেষভাগে কাঙ্গাল হরিনাথ চরম অর্থকষ্টে ভুগেছেন। সাংবাদিকতা থেকে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসেনি; বরং এসেছে নিঃসঙ্গতা। তবু তাঁর আদর্শে কোনো ফাটল ধরেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন—সময় বদলাবে, কিন্তু সত্যের মূল্য অক্ষুণ্ন থাকবে। এই বিশ্বাসই তাঁকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কলম আঁকড়ে রাখতে প্রেরণা জুগিয়েছে।

উত্তরাধিকার ও প্রাসঙ্গিকতা

আজকের গণমাধ্যমের জটিল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের জীবন ও কর্ম নতুন করে ভাবতে শেখায়। গ্রামকেন্দ্রিক সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস—সবকিছুর জন্য তাঁর কাছে আমাদের ফিরে যাওয়া জরুরি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সীমিত সম্পদ নিয়েও সাংবাদিকতা হতে পারে সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার।

কুষ্টিয়ার গর্ব, বাংলার গর্ব

কুষ্টিয়ার ইতিহাসে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার এক অনিবার্য অধ্যায়। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সাংবাদিকতা যদি মানুষের পক্ষে না দাঁড়ায়, তবে তার অর্থহীনতা বাড়ে। গ্রামবাংলার নিঃশব্দ কণ্ঠকে তিনি শব্দ দিয়েছিলেন; ইতিহাসে সেই শব্দ আজও প্রতিধ্বনিত।

সংক্ষেপে অবদানসমূহ

ক্ষেত্র অবদান
সাংবাদিকতা গ্রামবার্তা প্রকাশিকার প্রতিষ্ঠা ও গ্রামকেন্দ্রিক সাংবাদিকতা
সমাজসংস্কার নীলকর ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
সাহিত্য কবিতা ও গদ্যে মানবতাবাদী চিন্তা
লোকসংস্কৃতি বাউল দর্শন ও লালন-ভাবনার প্রসার
আদর্শ নির্ভীকতা, মানবিকতা ও সত্যনিষ্ঠা

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার আমাদের মনে করিয়ে দেন—সাংবাদিকতার মূল শক্তি সত্য, সাহস ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। কুষ্টিয়ার এই গর্ব শুধু অতীতের নায়ক নন; তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর জীবন ও কর্ম যত বেশি পাঠ করা হবে, ততই বাংলা সাংবাদিকতা সমৃদ্ধ হবে।

আজ ২০ জুলাই, কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের জন্মদিনে জিলাইভ কুষ্টিয়ার পক্ষ থেকে আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করি।