বাংলার ইতিহাসচর্চা, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও জ্ঞানভিত্তিক জাতিসত্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে যে ক’জন মনীষী নীরবে কিন্তু গভীরভাবে প্রভাব রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় একটি উজ্জ্বল নাম। আজ তাঁর জন্মদিনে “জিলাইভ কুষ্টিয়ার” পক্ষ থেকে এই মহাপ্রাণ চিন্তাবিদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। ইতিহাসকে কেবল রাজা-বাদশাহর কাহিনি হিসেবে নয়, সমাজের সামগ্রিক বিবর্তনের দলিল হিসেবে দেখার যে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি—তার ভিত্তি নির্মাণে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের অবদান অনস্বীকার্য।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় জন্মগ্রহণ করেন ১ মার্চ ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে, তৎকালীন নদীমাতৃক জনপদ—আজকের কুমারখালী, কুষ্টিয়া অঞ্চলে। এই মাটিই তাঁকে দিয়েছে ইতিহাসের প্রতি গভীর টান ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন জিজ্ঞাসু, পাঠপ্রিয় এবং বিশ্লেষণধর্মী মননের অধিকারী। পারিবারিক পরিবেশ ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক আবহ তাঁকে বইয়ের দিকে টেনে নেয়—যা ভবিষ্যতে তাঁকে এক নিষ্ঠাবান ইতিহাসবিদে রূপান্তরিত করে।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অক্ষয়কুমার আত্মশিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। ইতিহাস, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্যের বহুমাত্রিক পাঠ তাঁর চিন্তাকে করে তোলে পরিণত ও যুক্তিবাদী। ঔপনিবেশিক বাংলায় যখন ইতিহাসচর্চা অনেকাংশেই ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবে পরিচালিত, তখন তিনি দেশজ উৎস, দলিল ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—নিজস্ব ইতিহাস নিজস্ব চোখে না দেখলে জাতির আত্মপরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে অক্ষয়কুমার যুক্ত ছিলেন রাজশাহী অঞ্চলের সঙ্গে। বরেন্দ্রভূমির ইতিহাস, সমাজ ও প্রত্নসম্পদ তাঁর গবেষণার কেন্দ্রে ছিল। এই আগ্রহ থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি—যা বাংলার প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসচর্চায় এক মাইলফলক। পরবর্তীতে এই উদ্যোগ থেকেই গড়ে ওঠে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের সুসংহত কাঠামো।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের ইতিহাসচর্চার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তথ্যনিষ্ঠতা ও বিশ্লেষণ। তিনি অনুমান বা কিংবদন্তির বদলে শিলালিপি, তাম্রশাসন, লোকজ দলিল ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ওপর জোর দেন। ইতিহাস তাঁর কাছে ছিল সমাজের দীর্ঘ অভিযাত্রার মানচিত্র—যেখানে অর্থনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ক অনিবার্য।
তিনি স্পষ্ট করে দেখান যে, বাংলার ইতিহাস কেবল মধ্যযুগ বা ঔপনিবেশিক সময়ের সীমায় আবদ্ধ নয়; এর শিকড় প্রাচীন ও গভীর। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য পথনির্দেশক হয়ে ওঠে।
অক্ষয়কুমারের রচনাসম্ভার বৈচিত্র্যময়। ইতিহাসের পাশাপাশি সমাজভাবনা, সমালোচনা ও প্রবন্ধে তিনি যুক্তিবাদী কণ্ঠ তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষা ছিল প্রাঞ্জল কিন্তু কঠোর যুক্তিতে নির্মিত। তিনি ইতিহাসকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি একাডেমিক মানদণ্ডও অটুট রাখেন—যা আজও গবেষণার ক্ষেত্রে অনুসরণীয়।
ঔপনিবেশিক বাংলায় আত্মপরিচয়ের সংকট ছিল প্রকট। অক্ষয়কুমার বিশ্বাস করতেন—নিজস্ব ইতিহাস জানাই জাতির আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি। তিনি ইতিহাসকে ব্যবহার করেছেন আত্মমর্যাদা নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর কাজে দেখা যায়, ইতিহাস কেবল অতীতের বর্ণনা নয়; এটি বর্তমানের বোধ ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ।

ব্যক্তিজীবনে অক্ষয়কুমার ছিলেন সংযত, নীরব ও অধ্যয়নমগ্ন। খ্যাতি বা প্রচারের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল না। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পথপ্রদর্শক। তাঁর মানবিকতা প্রকাশ পায় স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণে অক্লান্ত পরিশ্রমে—যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সামষ্টিক ঐতিহ্যের কথা ভেবেছেন।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর চিন্তা, পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান আজও জীবিত। বরেন্দ্রভূমির প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ, বাংলার ইতিহাসচর্চায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ—সবখানেই তাঁর ছাপ সুস্পষ্ট।
কুমারখালী–কুষ্টিয়ার সন্তান অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় কেবল একটি জেলার নন—তিনি সমগ্র বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। তাঁর জন্মদিনে “জিলাইভ কুষ্টিয়ার” এই শ্রদ্ধা নিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজস্ব ইতিহাসকে জানাই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রথম ধাপ। কুষ্টিয়ার মাটি যেমন কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারকে দিয়েছে সাংবাদিকতার সাহসী কণ্ঠ, তেমনি অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়কে দিয়েছে ইতিহাসচর্চার দীপশিখা।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ১ মার্চ ১৮৬১ |
| জন্মস্থান | কুমারখালী, কুষ্টিয়া |
| কর্মক্ষেত্র | ইতিহাসচর্চা, প্রত্নতত্ত্ব |
| গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ | বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি |
| অবদান | বাংলার ইতিহাসে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতি |
| প্রয়াণ | ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ |

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় আমাদের শেখান—ইতিহাস মানে কেবল অতীত নয়, বরং দায়িত্ব। জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে সেই দায়িত্ব নতুন করে গ্রহণ করা। “জিলাইভ কুষ্টিয়ার” এই প্রয়াসের মধ্য দিয়ে আমরা সেই অঙ্গীকারই পুনর্ব্যক্ত করি।
