আগুনে নিঃস্ব কুমারখালী রেললাইনের ধারের অসহায় ৪ পরিবার - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

আগুনে নিঃস্ব কুমারখালী রেললাইনের ধারের অসহায় ৪ পরিবার

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ ‘মিচে কথা কবোনা। দুডে ছোয়াল মরার পরতে মানষে দেয়। খেতা, কম্বল, শাড়ি, খাট সব দিছিল মানষে। সব পুড়ে গেছে। এহন আর কিচ্ছু নাই। মনে হচ্ছে বুহির ভিতরে এহনও আগুন জ্বলতেছে। ওরে বাপ, কয়ডা টিনমিন যদি পাতাম, নাতি ছোয়ালডা নিয়ে এটু থাকতাম। ‘গতকাল শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) বিকেলে দুচোখের জল ছেড়ে বিলাপ করতে করতে কথা গুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ বৃদ্ধ জহুরা খাতুন। জহুরা কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী রেলপথের কুমারখালী পৌরসভা ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শেরকান্দি এলাকার মৃত কিয়ামুদ্দিন শেখের স্ত্রী। শুক্রবার গভীর রাতে তাঁর টিনের সাবড়া ঘরে আগুন লাগে। এতে তাঁর ঘর ও ঘরে থাকা যাবতীয় মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

বড় ছেলে মানিক ২০ বছর আগে এবং ছোট ছেলে রতন মারা গেছে ৩ বছর আগে। সেখানে তাঁর নাতি ছেলে আনোয়ার হোসেনের (২৭) সঙ্গে থাকতেন তিনি। জানা গেছে, শুধু জহুরা নয়, ওই রাতের আগুনে তাঁর ভ্যানচালক ভাতিজা কামাল হোসেন, তার ভ্যানচালক ছেলে হৃদয় হোসেন ( ২২) এবং প্রতিবেশী নাজিম উদ্দিনসহ চারজনের চারটি টিনের সাবড়া ঘর, দুইটি ব্যাটারি চালিত ভ্যান, চারটি ছাগল, ৯ টি চিনে হাঁস, ৩৫টি মুরগী ও ঘরে থাকা যাবতীয় আসবাব ও মাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বিদ্যুতের সর্টশার্কিট থেকে আগুন লেগে চারটি পরিবারের অন্তত ৮ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী রেলপথ ঘেঁষে বেশকিছু ঘনবসতি গড়ে উঠেছে।

সেখানকার অন্তত চারটি ঘর ও ঘরে থাকা যাবতীয় মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পড়ে আছে দুইটি পোড়া ভ্যানের অংশবিশেষ। দাঁড়িয়ে আছে শুধু ইট – সিমেন্টের তৈরি খুঁটি। সকাল পেরিয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তখনও বাতাসে পুড়া গন্ধ। বের হচ্ছে আগুনের ধোঁয়া। সেখানে উৎসুক জনতা ও স্বজনরা ভিড় করেছেন। এ সময় মৃত সালাম উদ্দিনের ছেলে নাজিম উদ্দিন সাহস বলেন, আগুনের পোড়া গন্ধে রাত আড়াইটার দিকে তার ঘুম ভেঙে যায়। দরজা খুলতেই তার ঘরের ভিতরে আগুন ঢুকে পড়ে।

তাড়াতাড়ি করে তখন তিনি এক কাপড়ে ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে বাইরে চলে যান। আর মূহুর্তেই সারাবাড়ি আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তার ভাষ্য, হৃদয়ের ভ্যান চার্জ দেওয়া ঘর থেকে আগুনের সুত্রপাত ঘটে। ক্ষতিগ্রস্থ হৃদয় হোসেন বলেন, রাত একটার দিকে দুইটি ভ্যান ও চারটি ছাগল দেখে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। ঘণ্টাখানেক পর হঠাৎ আগুন আগুন শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তখন চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলে স্থানীয়রা ছুটে এসে পানি ঢেলে আগুন নিভানোর চেষ্টা করে এবং ফায়ার সার্ভিস কে খবর দেওয়া হয়।

এরপর সবাই মিলে প্রায় একঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসলেও দুইটি ভ্যান, চারটি ছাগল, ৯টি হাঁস ও ৩৫টি মুরগী এবং দুইটি ঘর ও ঘরের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তার ভাষ্য, আগুনে চারটি পরিবারের অন্তত ৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেশী সাজু শেখ বলেন, ছুটে এসে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ৫০-৬০ মিলে পানি ঢেলেও আগুন নিভানো যায়নি। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিভায়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দুই-তিন মিনিটের পথ আসতে ফায়ার সার্ভিস সময় নিয়েছে অন্তত ৪৫ মিনিট। সেজন্য সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সরকারের সহযোগীতা ছাড়া পরিবার গুলো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেনা।

ক্ষতিগ্রস্থ কামাল হোসেনের স্ত্রী ময়না খাতুন বলেন, ‘ আমাদের পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই নেই। আগুনে পুড়ে সব শ্যাষ। বাকী আছে শুধুই খুঁটি। সরকারের কাছে সহযোগীতা চাই আমরা।’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কুমারখালী ফায়ার সার্ভিসের লিডার আলী হোসেন বলেন, রাত ৩টার দিকে ‘৯৯৯’ এর মাধ্যমে খবর পাই। ৩টা ৩ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টার নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে চারটি পরিবারের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের সুত্রপাত ও ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত শেষে পরে জানাবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, আগুনের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শীতবস্ত্র ও শুকনো খাবার প্রদান করা হয়েছে। লিখিত আবেদন পেলে বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপক্ষে সরকারিভাবে সহযোগীতা করা হবে।