আইনগত সহায়তা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার : বক্তারা - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

আইনগত সহায়তা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার : বক্তারা 

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ২৯, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ‘সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ’-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কুষ্টিয়ায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস। গতকাল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৮টার সময় বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে আলোচনা সভার মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা হয়। শুরুতে বেলুন এবং কবুতর উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয়।

পরে বর্ণাঢ্য র‌্যালিটি জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে কুষ্টিয়া কালেক্টরেট চত্বর এবং কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। এখানে লিগ্যাল এইডের রক্তদান কর্মসূচিসহ ছয়টি স্টলের উদ্বোধন করা হয়। পরে আদালত প্রাঙ্গনে কুষ্টিয়া জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়া জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান এবং সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. এনায়েত কবির সরকার।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, কুষ্টিয়া জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সিনিয়র সহকারি জজ মোঃ তারিক হাসান। অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন, কুষ্টিয়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়নাল আবেদীন, স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক তপন রায়,পারিবারিক আপীল আদালতের বিচারক সোহানী পুণ্য, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. ফিরোজ মামুন,

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদ বিন-হাসান, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, কুষ্টিয়া কৃষি নম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোঃ শওকত হোসেন ভূঁইয়া। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শেখ মোহাম্মদ আবু সাঈদ, সাধারণ সম্পাদক এসএম শাতিল মাহমুদ,

কুষ্টিয়া জজ কোর্টের পিপি এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, জিপি এ্যাডভোকেট মাহাতাব উদ্দিন, মামলায় সুবিচার প্রাপ্তি সুমি খাতুন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিমা বিশ্বাস ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থী অলক রায় প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সাধারণ মানুষের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে ২০০০ সালে আইন প্রণীত হলেও ২০২২ সালের সংশোধনী এর কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে লিগ্যাল এইড অফিসে সম্পাদিত চুক্তিগুলো আদালতের রায়ের সমতুল্য এবং সরাসরি কার্যকর, যা বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘসূত্রিতা ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিচ্ছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, জেলা লিগ্যাল এইড’র চেয়ারম্যান মোঃ এনায়েত কবির সরকার, তিনি বলেন, আইনগত সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি লিগ্যাল এইডের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। সরকার আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার পেতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থীদের সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা প্রদান করছে। সে লক্ষ্যে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহব্বান জানান তিনি।

সভায় সভাপতির বক্তব্যে কমিটির চেয়ারম্যান এবং সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. এনায়েত কবির সরকার বলেন, “আইনগত সহায়তা কেবল দান নয়, এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। কুষ্টিয়া জেলা লিগ্যাল এইড অফিস নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”

এছাড়া প্রধান অতিথি তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ এখন সহজেই আইনি পরামর্শ, আইনজীবী নিয়োগ এবং মামলা পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এখনো অনেকে বিষয়টি অবগত নেই। তাই আইনগত সহায়তা সেবা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।

সভায় বিশেষ অতিথি মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, যেকোনো সমস্যা বা বিরোধ আইনগত উপায়ে সমাধান করা উচিত। জনগণের জানমাল রক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি খরচে বিরোধ শেষ’ সবার আগে বাংলাদেশ। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা প্রদান করছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী সহজেই আইনি পরামর্শ ও সহায়তা পাচ্ছে, যা বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম নিয়ে সচেতনতামূলক বিশেষ নাটিকা ‘আইনের ছায়াতলে’। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও বিচারকবৃন্দের অভিনয়ে চিত্রিত এই নাটিকার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া দেখানো হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ প্যানেল আইনজীবীদের সম্মাননা স্মারক ও সনদ প্রদান করা হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত আইনজীবীরা হলেন- অ্যাডভোকেট হাশিনা মাহমুদা সিদ্দিকী এবং অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান রঞ্জু।

এছাড়া প্যানেল আইনজীবী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা আইনি সহায়তার এই বার্তা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে দেখা যায় জানুয়ারি ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত: মোট ১৫১৫টি প্রি-কেস আবেদনের মধ্যে ১৪২৭টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যার সাফল্যের হার ৯৪.১৯%।

এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ২ কোটি ১৪ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ টাকা আদায় করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রায় ২,০০৯ জন ব্যক্তিকে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।