বিশেষ প্রতিনিধি ॥ পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘরের মানুষ হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়ার দুই সহোদর অমি ও রনি। কুষ্টিয়ার মানুষ তাদেরকে কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদার হিসেবেই চেনেন। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে একের পর এক কিশোর গ্যাং গড়ে তোলেন তারা। তাদের ছত্রছায়ায় সজীব হয়ে উঠে এসকে সজীব।
অমি-রনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলের ব্যবসায়ীক পার্টনার। কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী মিলন শেখ ওরফে ডাল মিলনের ছেলে সজিব শেখ। সজিবের মা সালমা বেগম ও বোন মিলির নামেও রয়েছে একাধিক মাদক মামলা। সজিবের বড় ভাইয়ের নাম রাজিব শেখ। মাদক ব্যবসার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয় রাজিব। রাজিব মারা যাওয়ার পর ব্যবসার হাল ধরেন সজিব। বাবা ভাইয়ের ছায়া হারিয়ে ছায়াহীন সজীবের মাথার উপরে ছায়া হিসেবে দাঁড়িয়ে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘরের মানুষ খ্যাত অমি ও রনি। নিজেদের প্রয়োজনে সজীবকে দলে ভিড়িয়ে সজীব থেকে এসকে সজীব হিসেবে গড়ে তোলেন তারা।
অমি-রনির ছত্রছায়ায় থেকে কুষ্টিয়া শহরের ইঝই, ইখঅঈক খওঝঞ, ০০৭, ঠওকওঘএঝ, উঊঠওখঝ সহ নাম না জানা বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রন করতেন এসকে সজিব। শুরুতে শহর কবজা করার পর কুমারখালি, খোকসা, মিরপুর, দৌলতপুর সহ সদর উপজেলার সকল ইউনিয়নে কেক কেটে শুরু হয় সজিব গ্যাংয়ের যাত্রা। গত ৫ আগষ্ট স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার পতনের ১দিন পর ৭ আগস্ট পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা, হামলা, মারধর ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটিয়ে এসকে সজীব সহ ৯৮ বন্দি পালিয়ে যায়। মিলন নামের এক ব্যবসায়ীকে ৮ টুকরো করে হত্যা মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন।
কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এসকে সজীব এই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন। সজীবকে এখন পর্যন্ত আটক করতে পারেনি পুলিশ। স্কুল, কলেজের গণ্ডিতে পা না পড়লেও অমি-রনির ছত্রছায়ায় জেলা ছাত্রলীগের পদ পান এসকে সজীব। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে তার অপরাধের মাত্রা। তার নামে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মাদক, চাঁদাবাজি, হামলাসহ নানা অপরাধে এর আগে সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় তার দুই বছরের সাজাও হয়। জানা যায়, অমি-রনির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ইয়াসির আরাফাত তুষার ও সাদ আহম্মেদের কমিটিতে ২০১৭-১৮ সালের দিকে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদকের পদ পায় সজিব।
এরপর থেকেই অমি-রনির নির্দেশনায় কিশোর গ্যাং গঠন করে এলাকায় চাঁদাবাজি, মারপিট, মাদক কারবারসহ নানা অপকর্ম শুরু করেন তিনি। নানা অপরাধে জড়িত হওয়ার পরও সেই অমি-রনির চেষ্টায় জেলা ছাত্রলীগের সবশেষ কমিটিতে সহ-সভাপতির পদ পায় সজিব। তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। শহরে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে দেখা যেত তাকে । তবে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জের ওপর হামলাসহ নানা অপকর্মের কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় একটি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে তাকে বক্তব্যও দিতে দেখা গেছে।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত তুষার ও সাধারণ সম্পাদক মানব চাকী। আওয়ামী লীগের দলীয় একটি সূত্র জানায়, এসকে সজিবকে নানা অপকর্মে ব্যবহার করতেন অমি-রনি। সজিবের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী রয়েছে। মিছিল মিটিংয়ে কিশোরদের নিয়ে আসতো সজীব। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভাগ্যের চমকপ্রদ পরিবর্তন হয় শহরের আলফা মোড় এলাকার আব্দুল জলিলের দুই পুত্র অমি ও রনির। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তাদের গভীর সখ্যতার প্রভাব খাটিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয় সহ জেলার সকল সরকারী দপ্তর ও বেসরকারি দপ্তরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তারা। কয়েক বছরের মধ্যে বনে যান কোটিপতি।
