কনক হোসেন ॥ কোন পণ্য উৎপাদনের পূর্বে বেশ কিছু লাইসেন্স ও দাপ্তরিক ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। কেনোনা পণ্য উৎপাদনের পূর্বে অনেক নীতিমালা প্রণয়ন করে থাকে এইসব দপ্তর থেকে। সেই পণ্যটি যদি আবার খাদ্য পণ্য হয় তাহলে তো কথাই নেই। কেনোনা ভেজাল পণ্য খেলে মানুষের শরীরে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ রোগ এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। খাদ্য পণ্য বাজারজাত করার জন্য অন্তত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও মেয়াদের তারিখ থাকা বাধ্যতামূলক। কারণ যদি কোনো নাম ঠিকানাবিহীন প্যাকেটজাত খাদ্য পণ্য খেয়ে কারও মৃত্যুও ঘটে সেইক্ষেত্রে ঠিকানা ধরে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে পাওয়াটাও সম্ভব হবে না। এমনি এক ভয়ংকর ঘটনার সন্ধান মেলে গত ১২ ই জুন ইং তারিখে কুষ্টিয়া মিরপুর উপজেলা পরিষদের সামনে একটি চায়ের দোকানে দেখা যায় সারিবদ্ধভাবে বেশ কিছু পাউরুটি ঝুলানো , কিন্তু পাউরুটি গুলোতে কোন প্রকার লেবেল তারিখ কিছুই দেওয়া নেয়। দোকানিকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান এইগুলো নওয়াপাড়া বাজারে অবস্থিত সুজন বেকারীর পণ্য। বেকারীর মালিক এই ভাবেই দেদারসে পণ্য বাজারজাত করে যাচ্ছেন কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে। চরম অব্যবস্থাপনা ও সীমাহীন অনিয়মের সহিত চলছে সুজন বেকারী। লাগাম ছাড়া বেকারীর সত্ত্বাধিকারী আমিনউদ্দিন । দোকানদার ক্রেতা ও স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে জানাযায় যে উক্ত বেকারীর পণ্য খেয়ে ইতিমধ্যে একাধিক শিশু সহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ ফুড পয়জনিং ও ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছে। অধিক মুনাফা লাভের আশায় পঁচা ও বাসি পণ্য বাজারজাত করে জনজীবনকে হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছেন আমিনউদ্দীন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেকারীর একজন কর্মী জানান যে, প্রয়োজনীয়ও সবরকম লাইসেন্সবিহীন ভাবেই চলছে সুজন বেকারী। গত ১২ ই জুন স্বরজমিনে গিয়ে দেখা যায় উক্ত বেকারীর সব পণ্যই বি এস টি আইর লেভেল ও মেয়াদ দেওয়া নেই। মেয়াদ বিহীন বাসি পণ্য বাজারজাত ও সরবরাহ করে জনজীবন হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এদিকে বেকারীর মালিকরা পণ্যকে আকর্ষণীয় করতে কাপড় ও কাঠের রং, ব্যবহার করে থাকেন, বিস্কুট, পাউরুটি, কেক, মিষ্টিসহ নানা রকমের খাদ্য পণ্য তৈরিতে। মিরপুরের বেশিরভাগ বেকারি পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন শেষ নেই। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণেও রয়েছে চরম অব্যস্থাপনা। এর মধ্যে সুজন বেকারী অন্যতম। এদিকে সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিলেও অন্য দিকে খুনসুঁটি রয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর এর কর্মকর্তাদেরকে সন্তোষজনক মুনাফা দিয়েই চলছে সুজন বেকারী। সর্বোপরি বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স। থাকলেও মান বজায় রেখে উৎপাদন করা হচ্ছে না। অনুমোদন ছাড়াই বেকারি পণ্যের উৎপাদন এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে মানব স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন হুমকির মুখে পড়ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুজন বেকারির নেই ট্রেড লাইসেন্স, বিএসটিআই, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ, স্যানিটারি ও ট্রেডমার্ক ছাড়পত্র। এছাড়াও পণ্য রাখার ঘর যেমন অপরিষ্কার। পোকামাকড়েও ভরপুর। । স্বরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার নওয়াপাড়া বাজার থেকে পশ্চিম চুনিয়াপাড়া যাওয়ার রাস্তায় হাতের বাম পার্শ্বে গড়ে উঠেছে লাইসেন্সবিহীন সুজন বেকারী। সরকারি অনুমতি ছাড়াই মানহীন পণ্য উৎপাদন করে বাজারজাত করছে এই বেকারী। এসব বেকারীতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে তৈরি করা হচ্ছে বিস্কুট, চানাচুর, কেক, পাউরুটি, মিষ্টিসহ নানা মুখরোচক পণ্য। স্যাঁতসেঁতে নোংরা পরিবেশে ভেজাল ও নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে অবাধে তৈরি করা হচ্ছে বেকারিসামগ্রী। বেকারিতে ব্যবহৃত জিনিসগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শ্রমিকরা খালি পায়ে এসব পণ্যের পাশ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন। এ সময় তাদের গা থেকে ঘাম ঝরে পণ্যের ওপর পড়তে দেখা গেছে। আটা-ময়দা প্রক্রিয়াজাত করার কড়াইগুলোও অপরিষ্কার ও নোংরা। ডালডা দিয়ে তৈরি করা ক্রিম রাখা পাত্রগুলোতে ভন ভন করছে মাছির ঝাঁক। কয়েক দিনের পুরনো তেলেই ভাজা হচ্ছে পণ্যসমাগ্রী। অপরিচ্ছন্ন হাতেই প্যাকেট করা হচ্ছে এসব পণ্য। নেই কোনো স্যানিটারী ল্যাট্রিন আবার নেই কোনো হাত ধৌত করার সাবান না স্যানিটাইজার । উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ ছাড়াই সাধারণ পলিথিন মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে উক্ত বেকারীর পণ্য। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এসব খাদ্য মানবদেহের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। বেকারির মালিক আমিনউদ্দিনের কাছে বেকারী চালানোর সরকারি অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, আমার কোন লাইসেন্স নেই। আমি এইভাবেই লাইসেন্স ছাড়া বেকারির ‘ব্যবসা’ করে আসছি আপনাদের যা ইচ্ছা লিখতে পারেন। একজন দোকানদার জানান, সুজন বেকারী খুব কূটকৌশলের মাধ্যমে বাহিরের ভ্যানগাড়ির সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করে চুক্তিভিত্তিক কমিশনে, কোন প্রকার মেমো বা স্লিপ ছাড়াই দোকানগুলোতে পণ্য সাপ্লাই করে থাকে। খবরের কোনো তথ্য না জেনেই খাবার কিনে খাচ্ছেন ক্রেতারা। ক্রেতারা জানান খাবারে এমন ভেজাল মেনে নেয়া যায় না। অনিয়মের কথা স্বীকার করে বেকারি মালিক আমিনুদ্দিন জানান, আমার কোনো লাইসেন্স নেই , আমি কোনো মেয়াদের তারিখও দেয় না। এই বেকারী অন্য একজনের কাছে থেকে কিনে আমি দীর্ঘদিন এইভাবেই চালিয়ে আসছি। বেকারির পণ্য কিনে ভুক্তভোগী রুমন হোসেন বলেন, এক প্যাকেট পাউরুটি ও এক প্যাকেট বিস্কুট নিয়েছিলাম। বাসায় গিয়ে দেখি পাউরুটিটি নষ্ট ও পচা। বাচ্চারা বলছে দুর্গন্ধ। পরদিন দোকানদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান এই পণ্যের কোন মেয়াদ তারিখ না থাকায় বোঝা যায় না পণ্যটি কতদিন পূর্বে তৈরি। আমরা শুধু কিনি আর বেচি। বেকারীর মালিক কে তাও জানি না। পরে ডেলিভারি মানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলো উক্ত পণ্য সুজন বেকারীর। এদিকে ইতিপূর্বে উক্ত বেকারিতে প্রশাসনের একাধিক অভিযানের মাধ্যমে জরিমানা করেও বেকারিটি বন্ধ হয়ে নি। খুঁটির জোর কোথায়? কিন্তু তারা প্রকাশ্যে পণ্য উৎপাদন করে বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা বলেন, শুধু ক্ষতিকর রং নয়, দীর্ঘদিনের পোড়া তেল, পঁচা ও নষ্ট চিনির রস মেশানো হচ্ছে খাবারে। ওজনেও দেয়া হতে পারে কম করণ কিছু লেখা নেই। এতে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর মনে করে এসব বেকারিতে তৈরি ‘বিষ’ কিনে খাচ্ছে মানুষ। উপজেলার রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকার চা দোকাদার বলেন, আমরা গরিব মানুষ। ফুটপাথে চা-পান বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালাই। বেকারির তৈরি এসব খাবার উৎপাদনের তারিখ দেখার সময় নাই। আর বেশিরভাগ ক্রেতারা তো আর এসব জিজ্ঞেস করে না। ভেজাল খাদ্যপণ্যের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে এসব খাবার না খাওয়ার পরামর্শ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার পীযূষ সাহা বলেন, ভেজাল কেমিক্যাল ও নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি এসব খাবার খেলে ডায়রিয়া, পেট ব্যথা, চর্মরোগ, কিডনিতে সমস্যা, খাদ্যনালিতে সমস্যা, শরীর দুর্বলসহ জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের খাবার অবশ্যই আমাদের এড়িয়ে চলা উচিত। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা সহকারী পরিচালক সুচন্দন মন্ডল বলেন, ভেজাল খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তারপরও কোথাও অনিয়ম হলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
