নিজ সংবাদ ॥ প্রাপ্ত তথ্য মতে কুষ্টিয়া জেলাব্যাপী কম বেশী ২০৩ টি ইট ভাটা রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে এই সকল ইটভাটার মধ্যে মাত্র ১৫টি বৈধ ইটভাটা রয়েছে। যে সকল ইটভাটা বৈধ হিসাবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে সেই ইটভাটা গুলো নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ। বৈধ এবং অবৈধ ইটভাটায় দেদারছে কাঠ পোড়ানো হলেও এই বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত কারো নজরে আসে নাই। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া নির্দেশ দিলেও তা উপেক্ষা করে চলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। জানা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপপরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান দীর্ঘ দিন যাবত দক্ষিণ কোরিয়ায় অধ্যায়নরত।
আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার সিনিয়র কেমিস্ট মো. হাবিবুল বাশার কুষ্টিয়ার সর্বত্র তার রাজত্ব কায়েম করে চলেছে। খবর নিয়ে জানা যায়, মো. হাবিবুল বাশার ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সক্রিয় কর্মি ছিলেন। সেই সুবাদে গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি সহজেই কুষ্টিয়া সদর আসনের সাবেক সাংসদ মাহাবুবউল আলম হানিফের আস্থার ব্যক্তি ছিলেন। পরিবশে অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তাকে সাবেক সাংসদ ২০২২ সালের ১৩ মার্চ কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরে নিয়ে আসেন। কুষ্টিয়াতে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে এই কর্মকর্তা কুষ্টিয়া জেলাব্যাপী নিজস্ব বলয় গড়ে তুলেন। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি কুষ্টিয়ার সকল ইটভাটা সহ বড় বড় কলকারখানার মালিকদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
ইতিপূর্বে কুষ্টিয়ার বড় বড় চাল কল সহ মিল কারখানা ও ইট ভাটায় পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হলেও ২০২২ সালের পর থেকে তা প্রায় শুন্যের কোটায় নেমে এসেছে। খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, সাবেক এমপি মাহবুবউল আলম হানিফের নির্দেশে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা ও পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার সিনিয়র কেমিস্ট মো. হাবিবুল বাশার মিলে জেলাব্যাপী অভিযান না হওয়ার শর্তে বার্ষিক মোটা ঢাকা উপঢৌকন নিতে। যা আওয়ামী সরকারের শাসন আমলে অনেকটা টপ সিক্রেট ছিলো। আতাউর রহমান আতা ছিলেন সাবেক এমপি হানিফের চাচাতো ভাই এবং পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, বিগত তিন বছরে জেলার দৌলতপুর, ভেড়ামার, মিরপুর, কুমারখালী ও খোকসা উপজেলায় ইট পোড়ানো মৌসুমের নামমাত্র অভিযান হলেও কুষ্টিযা সদর উপজেলা ক্ষেত্রে সেই চিত্র ছিলো ভিন্ন।
গত দুই বছরে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বৈধ বা অবৈধ ইটভাটায় কোন অভিযান পরিচালনা করেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। শুধু ইটভাটা নয়, কুষ্টিয়া বটতৈল ও আইলচারা ইউনিয়নের সরকারী আদেশ উপেক্ষা করে ফসলী জমিতে অটো রাইল মিল সহ বড় বড় মিল কারখানা গড়ে উঠলেও পরিবেশ অধিদপ্তর আজ পর্যন্ত কোন কার্যকারী পদক্ষেপ গ্রহন করেছে বলে জানা যায় নাই। যদি এসব অনিয়মের চিত্র বিভিন্ন সময় স্থানীয় ও জাতীয় গনমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে এসব অনিয়মের বিষয়ে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তের কর্মকর্তারা নিরব ভূমিকায় পালন করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। তবে কি কারণে পরিবেশ অধিদপ্তের কর্মকর্তারা নিরব, তা অনেকটাই এখন স্পষ্ট। ইট পোড়ানো মৌসুম শুরু হওয়ার আগে কুষ্টিয়া জেলাব্যাপী তৎপর হয়ে ওঠে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, এক শ্রেণীর দালাল এবং ইটভাটা মালিকেরা।
এসকল ব্যক্তিদের অবস্থান যাই হোক না কেন, তাদের উদ্দেশ্য এখন আর কারো অজানা নয়। এই সিন্ডেকেটের সকলেই দিন শেষে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন বলেও জানা গেছে। এদিকে এই মৌসুমের শুরুতে গত ২ ডিসেম্বর (সোমবার) কুষ্টিয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে ৪টি ইটভাটা মালিককে ৬ লাখ টাকা জরিমানা ও একটি অবৈধ ইটভাটা আংশিক গুড়িয়ে দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সোমবার বেলা ১১ টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার চারুলিয়া ও আমকাঠালিয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত এই অভিযান পরিচালনা করেন। এর ঠিক দুই দিন পরে ৪ ডিসেম্বর (বুধবার) তিন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, র্যাব, আনছার, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যসহ অন্তত ৬০ জনের একটি সজ্জিত দল যাচ্ছিলেন অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ অভিযানে।
তবে তাঁরা একটি ইটভাটায়ও পৌছাতে পারেননি। তাঁদেরকেই পথেই আটকে দিয়েছেন অবৈধ ইটভাটা মালিক ও শ্রমিকরা। পথে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সাদা কাগজে শুধু ভাটা মালিকদের মুচলেকা নিয়ে কোনমতে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে প্রশাসনের এই সজ্জিত দলটি। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চরসাদিপুর ইউনিয়নের ভোমররার মোড়ে সকাল ১১ টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত অবরোধেরর পর মুচলেকা নেওয়ার ঘটনা ঘটে। সেখানে কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী ও পাবনা সদর উপজেলা প্রশাসন এবং কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথ অভিযান চালাতে গিয়ে এমন বাঁধার মুখে ফিরে আসেন। এই দুই অভিযানে প্রশাসন বাঁধার সন্মুখে পড়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ঘিরে। যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে। কিন্তু কিভাবে অভিযানের খবর আগেই ইটভাটা মালিকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তা নিয়ে খোদ প্রশাসনই রয়েছে গোলকধাঁধার মধ্যে। তবে এসব অনিয়ম ও দূর্ণীতির বিষয়ে জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট মো. হবিবুল বাসারের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নাই। জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে। অভিযানের বিষয়ে আমরা আরও সর্তকতা অবলম্বন করছি। অভিযানের আগে আর কেউ অভিযানের বিষয়ে জানতে পারবেনা।
